আমার নাম রূপা। অন্তত এই নামেই আমাকে পৃথিবীতে প্রথম ডাকা হয়েছিল। এখন আর কেউ এই নামে ডাকে না। নাম বদলে গেলে মানুষ বদলায় না। শুধু নিজের ভেতরের আয়নাটা একটু একটু করে ভেঙে যায়। একসময় এমন হয়, আয়নায় নিজের মুখ দেখলেও মনে হয়, এই মেয়েটাকে আগে কোথাও দেখেছি।

আমার বয়স তখন পনেরো। পৃথিবী সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুব বেশি ছিল না। আমি শুধু জানতাম, বর্ষার পর নদী ভরে ওঠে, কদম ফুল ফুটলে বৃষ্টি বেশি হয় আর মানুষ কাউকে ভালোবাসলে তাকে ছেড়ে চলে যায় না। শেষের কথাটা আমাকে কেউ শেখায়নি। নিজের মনেই বিশ্বাস করেছিলাম। মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো অন্য কেউ শেখায় না। মানুষ নিজেই বানিয়ে নেয়।

আমাদের গ্রামটার নাম কাশিপুর। মানচিত্রে খুঁজতে গেলে হয়তো পাওয়া যাবে। তবে মানচিত্রে কোনো গ্রামের গন্ধ আঁকা থাকে না। আমাদের গ্রামের গন্ধ ছিল ভেজা মাটি, ধানের শিষ আর সন্ধ্যায় রান্না হওয়া ভাতের। ফজরের আজান শেষ হওয়ার আগেই জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে যেত। দুপুর হলে স্কুলের মাঠ খালি হয়ে যেত। বিকেলে ছেলেরা ফুটবল খেলত। মেয়েরা পুকুরঘাটে কলসি ধুয়ে গল্প করত। পৃথিবীটা তখন এত ছোট ছিল যে মনে হতো, এই গ্রামের বাইরে আর কিছু নেই।

আমাদের বাড়িতে মানুষ ছিল দুজন। আমি আর আমার মা। বাবা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগে। কীভাবে মারা গেছেন, সেটা মা কোনোদিন খুলে বলেননি। শুধু বলতেন, নদী কাউকে নিয়ে গেলে সব প্রশ্নও সঙ্গে নিয়ে যায়। ছোটবেলায় আমি বিশ্বাস করতাম, নদীর তলায় নিশ্চয়ই একটা শহর আছে, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো বাস করে। বড় হওয়ার পর বুঝেছি, কিছু গল্পের শেষটা মানুষ মুখে বলে না। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে।

মা সেলাই করতেন। গ্রামের মানুষের ব্লাউজ, পেটিকোট, স্কুলড্রেস সেলাই করে যা আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চলত। অনেক রাত পর্যন্ত হারিকেনের আলোয় সেলাই মেশিন চলার শব্দ শুনে আমার ঘুম আসত। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম, মা একইভাবে বসে আছেন। চোখ লাল হয়ে গেছে। তবু মেশিন থামেনি। তখন মনে হতো, পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষ বোধহয় মায়েরাই।

একদিন রাতে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মা, এত কাজ করো কেন?”

মা সেলাই মেশিন থামালেন না। শুধু হেসে বললেন, “তুই মানুষ হবি বলে।”

“মানুষ তো আছিই।”

“না রে। মানুষ হয়ে জন্মানো আর মানুষ হয়ে বাঁচা এক জিনিস না।”

আমি কথাটার মানে বুঝিনি। শুধু দেখেছিলাম, হারিকেনের আলোয় মায়ের চোখ দুটো অদ্ভুত চকচক করছিল।

আমাদের উঠোনে একটা কদমগাছ ছিল। গাছটার সঙ্গে আমার অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। মন খারাপ হলেই গিয়ে গাছের নিচে বসে থাকতাম। মা হাসতে হাসতে বলতেন, “মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শিখ। গাছ কোনোদিন কথা বলে না।”

আমি বলতাম, “গাছ কথা বলে। শুধু শব্দ করে না।”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। “তোর কল্পনা খুব বেশি।”

আমি প্রতিবাদ করতাম, “তোমার নেই বলেই তুমি শুনতে পাও না।”

এই কথা শুনে মা হেসে উঠতেন। সেই হাসিটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু সেই ছোট্ট হাসির জন্যই হয়তো এত কষ্টের মধ্যেও সংসারটা টিকে ছিল।

সেদিন বিকেলে প্রথম ওকে দেখি।

নদীর ঘাটে আমি কলসি ধুচ্ছিলাম। পাশেই দুজন ছেলে জাল মেরামত করছিল। তাদের একজনকে আগে কখনো দেখিনি। ছেলেটা সাইকেল ঠেলে এসে বটগাছের নিচে দাঁড়াল। তার গায়ে নীল রঙের একটা শার্ট। হাতা গোটানো। মুখে হালকা দাড়ি উঠেছে। গ্রামের ছেলেদের মতো লাগছিল না। আবার শহরের ছেলেও মনে হচ্ছিল না।

আমি একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।

পাঁচ মিনিট পরে বুঝলাম, ছেলেটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “কিছু বলবেন?”

সে একটু হেসে বলল, “এই গ্রামের নাম কাশিপুর?”

“জি।”

“নদীর ওপারের রাস্তা কোন দিকে?”

আমি হাত তুলে দেখিয়ে দিলাম।

সে ধন্যবাদ দিল না। বরং আমার কলসিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা একা নিয়ে যেতে পারবেন?”

আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “পারব না মনে হয়?”

ছেলেটা হেসে ফেলল।

“না, মনে হলো সাহায্য লাগতে পারে।”

আমি কলসি তুলে কাঁধে রেখে বললাম, “আমার সাহায্য লাগে না।”

বাড়ি ফেরার পুরো পথজুড়ে মনে হচ্ছিল, ছেলেটা নিশ্চয়ই এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আমি একবারও পেছন ফিরে তাকাইনি। তবু অদ্ভুতভাবে বুঝতে পারছিলাম, সে আমার চলে যাওয়াটা দেখছে।

সেই রাতে খাওয়ার সময় মা হঠাৎ বললেন, “আজ তোকে খুব খুশি লাগছে।”

আমি চমকে উঠলাম।

“কোথায় খুশি?”

“মায়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া কঠিন।”

আমি ভাত নাড়তে নাড়তে বললাম, “কিছু না।”

মা আর কিছু বললেন না। শুধু মৃদু হেসে মাছের বড় টুকরোটা আমার থালায় তুলে দিলেন।

আজ এত বছর পর বুঝি, মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করে, তখন পৃথিবী তাকে কোনো সংকেত দেয় না। সূর্য ঠিক সময়েই ডুবে যায়। পাখিরা ঠিক সময়েই বাসায় ফেরে। মা আগের মতোই মেয়ের থালায় মাছ তুলে দেন।

শুধু ভাগ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে, মানুষ কত সহজে বিশ্বাস করতে পারে।

সোহেলের সঙ্গে আমার দেখা হওয়া যেন হঠাৎ করেই অভ্যাস হয়ে গেল। সে কখনো নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকত, কখনো বাজার থেকে ফেরার পথে হেঁটে হেঁটে গল্প করত। আশ্চর্যের বিষয়, সে কোনোদিন তাড়াহুড়া করত না। কখনো আমার হাত ধরতে চাইত না, কখনো এমন কোনো কথা বলত না যাতে আমি অস্বস্তি বোধ করি। এখন বুঝি, শিকারিরা প্রথমেই ফাঁদ দেখায় না। আগে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।

একদিন সে বলল, “তোমার মা খুব কষ্ট করেন, তাই না?”

আমি অবাক হয়ে গেলাম।

“আপনি জানলেন কীভাবে?”

“এই গ্রামে নতুন মানুষ আমি। সবাইকে দেখি, সবার কথা শুনি। তোমার মা সারারাত সেলাই করেন, এটা তো লুকানো কিছু না।”

আমি মাথা নিচু করলাম।

সোহেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ঢাকায় আমার এক বড় ভাইয়ের গার্মেন্টস আছে। মেয়েদের কাজ দেয়। থাকার জায়গা দেয়। বেতনও ভালো।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “আমি কোথাও যাব না।”

সে হেসে বলল, “আমি কি এখনই যেতে বলেছি?”

তারপর থেকে মাঝেমধ্যে সে ঢাকার গল্প করত। বড় রাস্তা, উঁচু ভবন, সারারাত জ্বলা বাতি, চাকরি করা মেয়েরা, মাস শেষে টাকা পাঠিয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। 

সেদিন রাতে মা বললেন, “রূপা, তুই আজকাল অনেক চুপচাপ।”

আমি হাসার চেষ্টা করলাম।

“বড় হচ্ছি তো।”

মা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে করে বললেন, “বড় হওয়া খারাপ না। কিন্তু বড় হতে গিয়ে যেন নিজের চোখ দুটো ছোট করে ফেলিস না।”

“চোখ ছোট মানে?”

“যখন মানুষ শুধু স্বপ্ন দেখে, তখন সামনে থাকা গর্তটা দেখতে পায় না।”

আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

আজও ভাবি, মায়েরা কি সত্যিই কিছু আগেই টের পান?

সেই সপ্তাহের শুক্রবারে সোহেল প্রথমবার আমাদের বাড়িতে এল। হাতে এক কেজি আপেল আর একটা বিস্কুটের টিন। মা প্রথমে নিতে চাইছিলেন না।

“এত কষ্ট করে আনতে হলো কেন বাবা?”

সোহেল মাথা নিচু করে বলল, “আপনাদের গ্রামের মানুষ আমাকে এত আপন করে নিয়েছে। খালি হাতে আসতে লজ্জা লাগছিল।”

মা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিলেন। সেই হাসির ভেতরেও আমি একটা অস্বস্তি দেখেছিলাম।

চা খাওয়ার সময় সোহেল বলল, “খালা, রূপা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো কাজ শিখত, মন্দ হতো না।”

মা বললেন, “গরিবের মেয়েদের ইচ্ছা দিয়ে সংসার চলে না বাবা।”

সোহেল শান্ত গলায় উত্তর দিল, “সংসার বদলাতেও তো কেউ না কেউ প্রথম পদক্ষেপ নেয়।”

পরের এক মাসে সোহেল যেন আমাদের গ্রামেরই একজন হয়ে গেল। চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিত, মসজিদের ইমাম সাহেবকে সালাম দিত, বয়স্ক মানুষ দেখলে মাথা নিচু করে কথা বলত। গ্রামের মানুষ খুব সহজেই তাকে আপন করে নিল। 

একদিন বিকেলে আমি কদমগাছের নিচে বসে ছিলাম। সোহেল সাইকেল ঠেলে এসে দাঁড়াল। তার মুখটা অদ্ভুত গম্ভীর।

আমি বললাম, “আজ এত চুপচাপ কেন?”

সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা কথা বলব। রাগ করবেন না।”

“আগে কথা বলেন। তারপর রাগ করব কি না ভাবব।”

সে হালকা হেসে আবার গম্ভীর হয়ে গেল।

“আমি ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি।”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। অথচ মুখে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম।

“ভালো। সবাই তো একদিন ফিরে যায়।”

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কষ্ট হচ্ছে?”

আমি চোখ সরিয়ে বললাম, “আপনি কে যে কষ্ট হবে?”

সোহেল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আপনি মিথ্যা বলতে পারেন না।”

আমি আর কোনো উত্তর দিলাম না। নদীর পানির দিকে তাকিয়ে রইলাম। পানির স্রোত তখন খুব ধীর। মনে হচ্ছিল, নদীও যেন কথা শুনছে।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “আমি ফিরে এসে আপনাকে বিয়ে করব।”

আমার বুক ধক করে উঠল।

“আমার মাকে এসব বলেছেন?”

“এখনো না। আগে একটা স্থায়ী কাজ হোক। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে আসব।”

আমি মাথা নিচু করে বললাম, “মা রাজি হবেন না।”

“আপনি রাজি থাকলে খালাকে রাজি করানো যাবে।”

আমি সেদিন কোনো উত্তর দিইনি। শুধু কদমগাছ থেকে একটা ফুল কুড়িয়ে ওর হাতে দিয়েছিলাম।

সে ফুলটা শার্টের বুকপকেটে রেখে বলেছিল, “এটা শুকিয়ে গেলেও ফেলে দেব না।”

সোহেল চলে যাওয়ার পর প্রায় তিন সপ্তাহ তার কোনো খবর ছিল না। তারপর এক বিকেলে ডাকঘরের পাশের দোকান থেকে খবর এল, আমার জন্য ফোন এসেছে। আমাদের গ্রামে তখন খুব কম মানুষের মোবাইল ছিল। দূরের আত্মীয়রা বাজারের ফোনে খবর দিত।

আমি দৌড়ে গেলাম।

ওপাশ থেকে সোহেলের গলা ভেসে এল।

“রূপা?”

“হ্যাঁ।”

“আমি কাজ পেয়ে গেছি।”

তার কণ্ঠে এমন আনন্দ ছিল যে আমিও না হেসে পারলাম না।

“সত্যি?”

“হ্যাঁ। থাকার ব্যবস্থাও আছে।”

আমি চুপ করে রইলাম।

সে একটু থেমে বলল, “তোমার মায়ের জন্যও ব্যবস্থা করতে পারব। কয়েক মাসের মধ্যে একটা ছোট বাসা নেব। তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।”

সেদিন বাড়ি ফিরে আমি মায়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। হারিকেনের আলোয় তিনি আগের মতোই সেলাই করছিলেন। চোখের নিচে কালি আরও গাঢ় হয়েছে।

আমি হঠাৎ বললাম, “মা, যদি আমাদের কষ্ট একদিন শেষ হয়ে যায়?”

মা মেশিন থামালেন।

“কষ্ট শেষ হয় না রে। শুধু মানুষ কষ্টের সঙ্গে থাকতে শিখে যায়।”

“যদি কেউ এসে কষ্ট কমিয়ে দেয়?”

মা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“যে মানুষ বিনা কারণে খুব বেশি সুখের কথা বলে, তাকে একটু দূর থেকে দেখিস। পৃথিবীতে বিনা দামে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মিথ্যা আশা।”

আমি প্রতিবাদ করলাম।

“সব মানুষ কি খারাপ?”

মা মাথা নাড়লেন।

“না। কিন্তু খারাপ মানুষগুলো ভালো মানুষের মুখোশ পরে আসে। এটাই ভয়।”

সেদিন রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। একদিকে ছিল মায়ের সতর্কতা, অন্যদিকে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। মানুষের জীবনে এমন কিছু রাত আসে, যখন সঠিক আর ভুলের মাঝখানে কোনো দেয়াল থাকে না। শুধু কুয়াশা থাকে।

সেই কুয়াশার ভেতর দিয়েই আমি হাঁটা শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম না, কয়েক দিনের মধ্যেই আমি প্রথমবারের মতো গ্রামের সীমানা পেরোব।

আমি কোনোদিন গ্রামের বাইরে যাইনি। উপজেলা শহর পর্যন্তও না। তাই ঢাকা আমার কাছে একটা জায়গা ছিল না, একটা গল্প ছিল। সেই গল্পে ছিল উঁচু উঁচু ভবন, চাকরি, মাস শেষে বেতন, মায়ের জন্য নতুন শাড়ি আর টিনের চাল বদলে পাকা ঘর।

যেদিন রওনা হলাম, মা ভোর থেকেই চুপচাপ ছিলেন। কোনো বকাঝকা নেই, কোনো উপদেশ নেই। শুধু বারবার আমার ব্যাগটা খুলে দেখছিলেন। কাপড় ঠিক আছে কি না, ওষুধ নিয়েছি কি না, টাকা আলাদা করে রেখেছি কি না। মানুষ যখন খুব ভয় পায়, তখন অদ্ভুত সব ছোট ছোট কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।

আমি বললাম, “মা, তুমি কাঁদছ কেন?”

তিনি তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ফেললেন।

“ধুলা ঢুকছে।”

আমি হেসে বললাম, “ঘরের ভেতর আবার ধুলা কোথায়?”

মা আমার কপালে চুমু খেলেন। অনেকক্ষণ ধরে কিছু বললেন না। তারপর খুব আস্তে বললেন, “কোনো জায়গায় যদি তোর মন না চায়, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসবি। মানুষের জীবন চাকরির চেয়ে বড়।”

আমি বললাম, “এত ভয় পাও কেন?”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ তুই আমার একমাত্র মেয়ে।”

আমি তাঁর হাত ধরে বললাম, “কয়েক মাসের মধ্যেই তোমাকে নিয়ে যাব। তখন আর রাত জেগে সেলাই করতে হবে না।”

মা হাসলেন। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে ভয় বেশি ছিল।

বাস ছাড়ার সময় তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি জানালার কাঁচে হাত রাখলাম। মা দূর থেকে হাত নেড়ে শুধু একটা কথাই বললেন।

“নিজেকে হারিয়ে ফেলিস না।”

সোহেল আমার পাশের সিটে বসেছিল। পুরো পথ সে নানা গল্প করছিল। ঢাকার কথা, তার অফিসের কথা, নতুন জীবনের কথা। মাঝে মাঝে সে আমাকে পানি খেতে দিচ্ছিল, ফল কিনে দিচ্ছিল। বাসের অন্য যাত্রীরা তাকিয়ে দেখছিল। হয়তো ভাবছিল, নতুন বিয়ে হয়েছে। হয়তো ভাবছিল, প্রেম করে পালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। 

বিকেলের দিকে বাস ঢাকায় ঢুকল।

আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম।

এত গাড়ি আমি কোনোদিন দেখিনি। এত মানুষও না। সবাই কোথাও ছুটছে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। গ্রামের মতো কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকছে না। শহরটা যেন একটা বিশাল নদী, যেখানে মানুষ স্রোতের মতো ভেসে যাচ্ছে।

আমি আস্তে করে বললাম, “এত মানুষ!”

সোহেল হেসে বলল, “এখানে কেউ কাউকে চেনে না। এটাই ঢাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা।”

বাসস্ট্যান্ডে নেমে সে একটা রিকশা ডাকল। তারপর আবার মত বদলে একটা মাইক্রোবাসের দিকে এগিয়ে গেল। গাড়িটা সাদা রঙের। কাঁচ কালো।

ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটা সোহেলকে দেখেই বলল, “অনেক দেরি করলি।”

সোহেল হেসে উত্তর দিল, “রাস্তা জ্যাম ছিল।”

লোকটা একবার আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা আমার ভালো লাগেনি। 

আমি ফিসফিস করে বললাম, “উনি কে?”

সোহেল খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “অফিসের লোক।”

আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে ধীরে ধীরে সরু গলির দিকে ঢুকতে লাগল। চারপাশের ভবনগুলো যেন আকাশটাকেও ঢেকে ফেলেছে। কোথাও কোনো গাছ নেই। বাতাসেও গ্রামের মতো গন্ধ নেই। শুধু ধোঁয়া আর গরম।

আমি বললাম, “এটা কি তোমার অফিসের রাস্তা?”

সোহেল জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল, “আগে একটা জায়গায় যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“কাগজপত্র করতে।”

“কী কাগজপত্র?”

সে হাসল।

“চাকরি করতে হলে অনেক নিয়ম থাকে।”

কথাটা শুনে আমি নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বুকের ভেতর অকারণে একটা অস্বস্তি জমতে লাগল।

মা বলেছিলেন, মন যদি না চায়, ফিরে আসবি।

মাইক্রোবাসটা ধীরে ধীরে একটা পুরোনো তিনতলা ভবনের সামনে গিয়ে থামল। বাইরে থেকে দেখে জায়গাটাকে কোনো অফিস মনে হলো না। সাইনবোর্ড নেই। জানালাগুলো বন্ধ। লোহার গেটটা ভেতর থেকে তালা দেওয়া।

আমি সোহেলের দিকে তাকালাম।

সে আমার দিকে তাকাল না। শুধু খুব নিচু গলায় বলল,

“নামো।”

আমি গাড়ি থেকে নামলাম। গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা একবার সোহেলের দিকে তাকাল, তারপর আমার দিকে। তার চোখে কোনো কৌতূহল ছিল না। যেন সে আগেই জানত আমি আসব।

গেট খুলতেই একটা ধাতব শব্দ হলো। শব্দটা খুব সাধারণ। অথচ আজও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কখনো কখনো আমার কানে সেই শব্দ ফিরে আসে। 

ভেতরে ঢুকে দেখি ছোট্ট একটা উঠোন। চারদিকে উঁচু দেয়াল। ওপরে আকাশ দেখা যায়, কিন্তু খুব অল্প। যেন আকাশটাকেও মেপে রাখা হয়েছে।

আমি সোহেলকে বললাম, “এটা অফিস?”

সে উত্তর দিল না।

একজন মাঝবয়সী নারী ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। গায়ে দামি শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ। মুখে হাসি ছিল, কিন্তু সেই হাসি চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

তিনি আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বললেন, “এই মেয়ে?”

সোহেল মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”

“কাগজপত্র আছে?”

“যা বলেছিলেন সব এনেছি।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কী কাগজপত্র?”

দুজনের কেউই আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না।

নারীটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বললেন, “ভয় পেয়ো না মা। আগে একটু বিশ্রাম নাও। অনেক পথ এসেছ।”

আমি বললাম, “চাকরিটা কোথায়?”

তিনি হেসে বললেন, “সবই হবে। আগে বিশ্রাম।”

সেই হাসিটা আমার ভালো লাগেনি।

আমাকে একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটা পরিষ্কার। একটা খাট, একটা চেয়ার, একটা টেবিল। জানালায় মোটা গ্রিল। বাইরে থেকে পর্দা টানা।

আমি ব্যাগটা নামিয়ে সোহেলের দিকে তাকালাম।

“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

সে বলল, “একটু কাজ আছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসছি।”

“আমিও যাব।”

“না, তুমি থাকো।”

আমি হেসে বললাম, “একলা থাকতে ভালো লাগবে না।”

সে প্রথমবারের মতো বিরক্ত হলো।

“এক ঘণ্টা বসে থাকতে পারবে না?”

তার গলার স্বরটা নতুন ছিল। গ্রামের নদীর পাড়ে যে ছেলেটা আস্তে আস্তে কথা বলত, তার সঙ্গে এই মানুষটার কোনো মিল খুঁজে পেলাম না।

আমি চুপ করে গেলাম।

সে বেরিয়ে গেল।

দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হলো।

তারপর…

টক করে একটা শব্দ।

বাইরে থেকে তালা লাগানোর শব্দ।

আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলাম না।

দরজার কাছে গিয়ে হাত রাখলাম।

“ভাই… দরজাটা বন্ধ কেন?”

কেউ উত্তর দিল না।

আমি আবার ডাকলাম।

“সোহেল!”

নীরবতা।

আরও জোরে ডাকলাম।

“সোহেল! শুনছ?”

করিডোরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। মনে হলো কেউ থামল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল।

আমার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।

প্রথমবার দরজায় ধাক্কা দিলাম।

“দরজা খুলুন।”

কোনো উত্তর নেই।

দ্বিতীয়বার আরও জোরে ধাক্কা দিলাম।

“আমি এখানে থাকব না।”

তারপর বাইরে থেকে সেই মাঝবয়সী নারীর গলা ভেসে এল।

“চিৎকার করে লাভ নেই মা। গলা ব্যথা হবে।”

আমি কাঁপা গলায় বললাম, “সোহেল কোথায়?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন,

“যে কাজের জন্য এসেছিল, সেটা শেষ করে চলে গেছে।”

আমার মনে হলো কথাটা ঠিক বুঝতে পারিনি।

“মানে?”

তিনি এবার আরেকটু কাছে এসে বললেন,

“তোমাকে রেখে গেছে।”

আমি বললাম, “না… না, আপনি ভুল বলছেন। সে একটু পরে আসবে।”

নারীটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এখানে যারা আসে, সবাই প্রথম দিন এই কথাটাই বলে।”

আমি দরজায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

হঠাৎ মনে পড়ল, মা বাস ছাড়ার আগে কী বলেছিলেন।

“নিজেকে হারিয়ে ফেলিস না।”

সেদিন আমি কতক্ষণ দরজার পাশে বসে ছিলাম, মনে নেই। সময় তখন আর ঘড়িতে মাপা যাচ্ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল, একটু পরেই সোহেল ফিরে আসবে। নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমাকে ভুল ঘরে আটকে রেখেছে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সত্যিটাকে নয়, নিজের মনকে বিশ্বাস করতে চায়।

বিকেলের দিকে দরজার তালা খুলল। সেই একই নারী ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে স্টিলের থালা। ভাত, ডাল, ডিমভাজি। তিনি থালাটা টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বললেন, “খেয়ে নাও।” 

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমাকে বাড়ি যেতে হবে। আমার মা একা আছে। সোহেল কোথায়?” 

তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন এই প্রশ্ন তিনি হাজারবার শুনেছেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার মায়ের কথা এখন ভাবলে কষ্ট বাড়বে। আগে খাও।” আমি মাথা নাড়লাম। “আমি খাব না। আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন।”

নারীটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর দরজার দিকে ফিরে গিয়ে বললেন, “তিন দিন না খেলে সবাই খায়।” তাঁর গলায় রাগ ছিল না। ভয়ও ছিল না। ছিল শুধু অভ্যাস। যেন তিনি মানুষের কান্না, অনুনয়, অভিশাপ, সবকিছু শুনতে শুনতে একসময় আর কিছুই অনুভব করেন না।

রাতের দিকে পাশের ঘর থেকে একজন মেয়ের কান্না ভেসে আসছিল। কান্নাটা খুব জোরে ছিল না। বরং এত চাপা ছিল যে মনে হচ্ছিল, সে ইচ্ছে করেই নিজের শব্দ লুকিয়ে রাখছে। কিছুক্ষণ পর আরেকজনের গলা শোনা গেল। “চুপ কর। কান্না করলে ওরা খুশি হয়।” এই প্রথম বুঝলাম, আমি একা নই।

পরদিন সকালে দরজা খুলে আমাকে নিচতলার একটা বড় ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ছয়-সাতজন মেয়ে বসে ছিল। কারও বয়স আমার কাছাকাছি, কারও একটু বেশি। কেউ মাথা নিচু করে বসে আছে, কেউ শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। তাদের চোখে আমি একই জিনিস দেখলাম। ভয় নয়। ভয় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। যা বাকি আছে, তার নাম শূন্যতা।

হঠাৎ একজন মেয়ে আমার পাশে এসে বসল। খুব আস্তে বলল, “নতুন?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ।”

সে আরেকটু নিচু গলায় বলল, “কত দিন হলো?”

“গতকাল এসেছি।”

মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর এমন একটা হাসি হাসল, যেটাকে হাসি না বলে ভাঙা মানুষের অভ্যাস বলা ভালো। “আমিও একদিন গতকাল এসেছিলাম।”

আমি কিছু বুঝতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আর কিছু বলল না।

ঠিক তখনই ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই একসঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে সেই নারী নেমে আসছেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই। যেন এই বাড়ির প্রতিটি ইট তাঁর ইশারায় নড়ে।

তিনি সামনে এসে দাঁড়াতেই একজন লোক চেয়ার টেনে দিল। তিনি বসলেন। তারপর প্রথমবার আমার দিকে সরাসরি তাকালেন।

“তোমার নাম কী?”

আমি বললাম, “রূপা।”

তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, “না।”

আমি অবাক হলাম।

“মানে?”

“আজ থেকে এই নাম নেই।”

আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

“আমার নাম রূপা।”

তিনি টেবিলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললেন, “যে নাম নিয়ে এখানে ঢুকেছ, সেটা গেটের বাইরেই রেখে এসেছ। এখানে নাম আমরা দিই। বয়সও আমরা লিখি। পরিচয়ও আমরা বানাই।”

আমি প্রতিবাদ করলাম, “আপনারা কে?”

তিনি এবার মৃদু হাসলেন। সেই হাসির ভেতর কোনো উষ্ণতা ছিল না।

“সবাই আমাকে সরদার মা বলে ডাকে। তুমিও তাই ডাকবে।”

আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “আমি ডাকব না।”

ঘরের ভেতর সবাই আরও নিচু হয়ে গেল। পাশের মেয়েটা আমার হাত চেপে ধরল। তার হাত ঠান্ডা।

সরদার মা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আমার সামনে এসে থামলেন। তাঁর চোখে রাগ ছিল না। বরং এক ধরনের কৌতূহল।

“নতুন মেয়েরা প্রথম দিন সবাই সাহসী থাকে।”

আমি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি খুব আস্তে বললেন, “দেখি, তোমার সাহসটা কত দিন থাকে।”

সেদিন আমি জানতাম না, তিনি শুধু আমাকে ভয় দেখাচ্ছিলেন না। তিনি আমার ভেতরের মানুষটাকে ভেঙে ফেলতে চাইছিলেন। কারণ এই বাড়ির নিয়ম খুব সহজ।

যে মানুষ নিজের পরিচয় ভুলে যায়, তাকে বন্দি করে রাখতে শিকলের দরকার হয় না।

সকালে দরজা খুলতেই আমাকে নিচতলার বড় ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। আগের দিনের মেয়েগুলো সবাই সেখানে বসে আছে। কেউ মেঝে মুছছে, কেউ রান্নাঘরের সবজি কাটছে, কেউ কাপড় ভাঁজ করছে। বাড়িটা বাইরে থেকে যতটা নিঃশব্দ, ভেতরে ততটাই নিয়মে বাঁধা। যেন একটা অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান। এখানে কারও হাসি নেই, কিন্তু কাজ থেমে থাকে না।

আমি পাশে বসা মেয়েটাকে ফিসফিস করে বললাম, “তোমার নামটা বলবে?”

সে চারপাশে একবার তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “এখানে আমার নাম শিউলি।”

“এখানে মানে?”

সে তিক্ত হেসে বলল, “বাইরে আমার অন্য নাম ছিল। এখন আর সেটা কাউকে বলি না।”

“কেন?”

“কারণ একদিন ভুলে যাব। তখন মনে পড়লে আরও কষ্ট হবে।”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

ঠিক তখন সরদার মা ঘরে ঢুকলেন। আজও তাঁর মুখে সেই একই শান্ত ভাব। তিনি একে একে সবার দিকে তাকালেন। কারও সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বললেন না। শুধু কাজের নির্দেশ দিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, কেউ তাঁর কথা অমান্য করল না।

আমার সামনে এসে তিনি থামলেন।

“খেয়েছ?”

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

তিনি আবার বললেন, “রাগ করে না খেলে ক্ষুধা কমে না।”

আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, “আমাকে বাড়ি যেতে দিন।”

তিনি কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “এখানে যারা আসে, সবাই প্রথমে বাড়ি যেতে চায়।”

“আমি অন্যদের মতো না।”

“এখানকার প্রত্যেকেই প্রথম দিন এই কথাটা বলেছিল।”

কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন।

আমি দাঁতে দাঁত চেপে রইলাম। মানুষকে অপমান করার জন্য সবসময় গালির দরকার হয় না। কখনো কখনো একই বাক্য বারবার বলাই যথেষ্ট।

দুপুরের দিকে রান্নাঘরে কাজ করতে করতে শিউলি বলল, “তুমি পালানোর কথা ভাবছ?”

আমি চমকে উঠলাম।

“তুমি বুঝলে কীভাবে?”

সে আলু কাটতে কাটতেই বলল, “নতুন যারা আসে, তাদের চোখে একটা জিনিস থাকে। দরজা, জানালা, সিঁড়ি, তালা, সব গুনে গুনে দেখে।”

আমি ধীরে বললাম, “পালানো যায় না?”

শিউলি মাথা তুলল না।

“চেষ্টা হয়।”

“তারপর?”

“সব চেষ্টা সফল হয় না।”

আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম। ঠিক তখনই রান্নাঘরের দরজার সামনে সাত-আট বছরের একটা ছেলে এসে দাঁড়াল। খুব রোগা। গায়ে ময়লা জামা। হাতে একটা ভাঙা খেলনা গাড়ি।

সে শিউলিকে বলল, “আপা, পানি দিবা?”

শিউলি গ্লাসে পানি ঢেলে দিল।

ছেলেটা পানি খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

সেই হাসিটা অদ্ভুত। এত অন্ধকার জায়গায়ও শিশুরা কীভাবে হাসতে পারে, সেটা আজও আমার কাছে বিস্ময়।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ও কে?”

শিউলি খুব আস্তে বলল, “রনি।”

“এখানে কেন?”

সে উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

“ও একা না। আরও আছে।”

“আরও?”

শিউলি মাথা নেড়ে রান্নাঘরের পেছনের করিডোরের দিকে ইশারা করল।

“ওই দিকটায় থাকে।”

আমার বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠল।

“ওদের পরিবার?”

“কেউ খুঁজছে, কেউ হয়তো জানেই না ওরা কোথায়।”

আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম।

সেদিন প্রথমবার আমার নিজের ভয়টা একটু সরে গিয়ে অন্য একটা অনুভূতি জন্ম নিল। এই বাড়িতে শুধু আমার জীবনই আটকে নেই। আরও অনেকগুলো জীবন এখানে নিঃশব্দে আটকে আছে।

রাতে ঘরে ফিরে দেয়ালে আবার টোকা দিলাম।

“শিউলি…”

ওপাশ থেকে উত্তর এল।

“হুঁ?”

আমি বললাম, “এখানে ছোট ছোট বাচ্চাও আছে।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর খুব আস্তে সে বলল, “ওদের জন্যই আমি এখনো বেঁচে আছি।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

সেই মুহূর্তে প্রথমবার মনে হলো, যদি কোনোদিন এই বাড়ি থেকে বের হতে পারি, তাহলে একা বের হব না।

কিন্তু তখনও জানতাম না, এই সিদ্ধান্তই একদিন আমাকে সরদার মায়ের সামনে দাঁড় করাবে। আর সেই দিনের পর এই বাড়ির ইতিহাস আর আগের মতো থাকবে না।

মানুষ খুব অদ্ভুতভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। প্রথম দুদিন আমি প্রতি ঘণ্টায় দরজার দিকে তাকাতাম। তৃতীয় দিনে কমে গেল। চতুর্থ দিনে বুঝলাম, এখানে সময়ের হিসাব সূর্য দেখে রাখা যায় না। জানালায় এমনভাবে গ্রিল বসানো যে আকাশের শুধু একটা সরু ফালি দেখা যায়। সকাল, দুপুর, বিকেল, সব একই রকম লাগে। শুধু সেই ছোট্ট নীল অংশটা ধীরে ধীরে রঙ বদলায়। আমি প্রতিদিন সেটাই দেখতাম। মনে হতো, আকাশ অন্তত এখনো কারও বন্দি হয়নি।

সকালের কাজ শেষ করে সবাই যখন একটু বসার সুযোগ পেল, তখন শিউলি খুব নিচু গলায় বলল, “তোমার মায়ের কথা এখনো মনে পড়ে?” প্রশ্নটা শুনে আমি হেসে ফেললাম। হাসিটা নিজের কাছেই অচেনা লাগল। “একদিনও কি ভুলেছি?” শিউলি মাথা নিচু করে বলল, “ভালো। যত দিন মনে থাকবে, তত দিন তুমি পুরোপুরি হারাওনি।” আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি ভুলে গেছ?” সে উত্তর দিল না। শুধু মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই নীরবতাই ছিল তার উত্তর।

বাড়িটার ভেতরে কিছু নিয়ম ছিল, যেগুলো কেউ লিখে রাখেনি কিন্তু সবাই জানত। অনুমতি ছাড়া কোনো দরজা খোলা যাবে না। জানালার কাছে বেশি সময় দাঁড়ানো যাবে না। ফিসফিস করে কথা বলা যাবে, কিন্তু দল বেঁধে নয়। রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পরে কোনো শব্দ করা যাবে না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, এই নিয়মগুলোর বেশিরভাগই কেউ মুখে বলত না। পুরোনো মেয়েরা নতুনদের দেখে দেখে শিখিয়ে দিত। যেন ভয়ও এক ধরনের উত্তরাধিকার।

দুপুরের দিকে একজন বৃদ্ধ লোক এলেন। তাঁর হাতে একটা খাতা। তিনি একে একে সবার দিকে তাকিয়ে কিছু লিখছিলেন। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম?” আমি স্পষ্ট গলায় বললাম, “রূপা।” তিনি খাতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখানে তোমার নাম রেশমা।” আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলাম, “না। আমার নাম রূপা।” লোকটা মাথাও তুলল না। শুধু খাতায় কিছু লিখে পরের জনের কাছে চলে গেল। যেন আমার আপত্তির কোনো মূল্যই নেই।

সন্ধ্যায় সরদার মা আমাকে ডাকলেন। তাঁর ঘরটা বাড়ির অন্য ঘরগুলোর মতো ছিল না। পরিপাটি করে সাজানো। বুকশেলফে বই আছে, দেয়ালে ঘড়ি, জানালার পাশে টবে মানিপ্ল্যান্ট। বাইরে থেকে কেউ দেখলে ভাববে, একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের বসার ঘর। আমি ভেতরে ঢুকতেই তিনি চেয়ার দেখিয়ে বললেন, “বসো।”

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

তিনি মৃদু হেসে বললেন, “জেদ মানুষের ভালো গুণ। তবে সব জায়গায় না।”

আমি চুপ করে ছিলাম।

তিনি টেবিলের ওপর রাখা এক কাপ চায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি জানো, মানুষকে বন্দি রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?”

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

তিনি নিজেই বললেন, “লোহার শিক না। ভয়ও না। আশা। মানুষকে যদি বিশ্বাস করানো যায় যে কাল সব ঠিক হয়ে যাবে, তাহলে সে আজ বিদ্রোহ করে না।”

আমি প্রথমবার তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।”

তিনি হালকা মাথা নেড়ে বললেন, “সেটা ভালো। কিন্তু একটা সময় আসবে, যখন তুমি আর কাউকেই বিশ্বাস করতে পারবে না। তখন দেখবে, আমার কথাগুলোই সবচেয়ে সহজ মনে হচ্ছে।”

আমি কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। তাঁর কথাগুলো কানে বাজছিল। তিনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিলেন না। তিনি অপেক্ষা করছিলেন। মানুষ ভেঙে পড়ার জন্য কতটা সময় লাগে, তিনি যেন সেটা খুব ভালো করেই জানতেন।

রাতে খাবার শেষে ছোট্ট ছেলেটা, আবার আমার কাছে এল। হাতে সেই ভাঙা খেলনা গাড়িটা। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আপা, তুমি নতুন?” আমি মাথা নেড়ে হেসে বললাম, “হ্যাঁ।” সে বলল, “নতুনরা প্রথমে অনেক কাঁদে। পরে আর কাঁদে না।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কীভাবে জানো?” রনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি অনেক নতুন আপা দেখেছি।”

ওর কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। একটা আট বছরের শিশু এমন একটা বাক্য কীভাবে এত স্বাভাবিকভাবে বলতে পারে?

সেদিন রাতে আমি অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারিনি। জানালার ছোট্ট ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, গ্রামের সেই কদমগাছটা এখন হয়তো ফুলে ভরে গেছে। মা হয়তো রাত জেগে সেলাই করছেন। মাঝেমধ্যে দরজার দিকে তাকাচ্ছেন। হয়তো এখনো বিশ্বাস করছেন, আমি একদিন ফিরে এসে বলব, “মা, আমি চলে এসেছি।”

আমি জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরলাম।

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙল আজানের শব্দে। শব্দটা খুব দূর থেকে আসছিল। এত দূর যে মনে হচ্ছিল, অন্য কোনো পৃথিবী থেকে ভেসে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। গ্রামের মসজিদের আজানটা এমন ছিল না। সেখানে শব্দের সঙ্গে ভোরের বাতাস মিশে থাকত, মোরগের ডাক মিশে থাকত, বাঁশবাগানের পাতার শব্দ মিশে থাকত। এখানে শুধু ইট, কংক্রিট আর প্রতিধ্বনি।

দরজা খুলতেই সবাইকে নিচে ডাকা হলো। সকালের নাশতা শেষ করে যে যার কাজে লেগে গেল। আমাকে সেদিন প্রথমবার পুরো বাড়িটার কয়েকটা অংশ পরিষ্কার করতে দেওয়া হলো। একজন মহিলা আমার সঙ্গে ছিলেন। তাঁর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তিনি শুধু বললেন, “যেদিকে যেতে বলা হবে, শুধু সেদিকেই যাবে। অন্য কোথাও তাকানোর দরকার নেই।”

আমি মাথা নেড়ে কাজ করতে লাগলাম। কিন্তু মানুষের চোখকে সবসময় আদেশ মানানো যায় না। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় খেয়াল করলাম, প্রতিটা দরজার বাইরেই আলাদা তালা। কোথাও ছোট, কোথাও বড়। কিছু দরজার নিচ দিয়ে আলো বের হচ্ছে। কোথাও আবার সম্পূর্ণ অন্ধকার।

একটা দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খুব আস্তে একটা কণ্ঠ শুনলাম।

“আপা…”

আমি থেমে গেলাম।

মহিলা সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় বললেন, “চল।”

আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর আবার সেই ডাক।

“আপা… একটু শুনবেন?”

কণ্ঠটা এত অসহায় ছিল যে আমি অজান্তেই পেছন ফিরে তাকালাম। দরজার নিচের সরু ফাঁক দিয়ে একটা ছোট্ট কাগজ বের হয়ে আছে।

মহিলা তখন অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি খুব দ্রুত কাগজটা পায়ের নিচে চাপা দিলাম। কিছুক্ষণ পরে সুযোগ বুঝে সেটা কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে ফেললাম।

সারাদিন বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক করছিল।

রাতে নিজের ঘরে ফিরে কাগজটা খুললাম।

তাতে মাত্র তিনটি লাইন লেখা।

“আমার নাম মিতা। যদি কখনো বের হতে পারো, কুমিল্লার দেবীদ্বারে আমার মাকে বলো, আমি শেষ পর্যন্ত ওনাকে ভুলিনি।”

কাগজের নিচে কোনো ঠিকানা নেই।

কোনো তারিখ নেই।

শুধু শেষ কোণে ছোট্ট করে লেখা,

“যদি তখনও উনি বেঁচে থাকেন।”

আমি অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটা মানুষ কত দিন বন্দি থাকলে নিজের মায়ের বেঁচে থাকার ব্যাপারেও নিশ্চিত থাকতে পারে না?

হঠাৎ মনে হলো, এই বাড়ির দেয়ালের ভেতরে কত শত অসমাপ্ত চিঠি জমে আছে, যেগুলো কখনো তাদের ঠিকানায় পৌঁছায়নি।

পরদিন সুযোগ পেয়ে আমি শিউলিকে কাগজটার কথা বললাম। সে পড়েই ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

“এটা কোথায় পেয়েছ?”

আমি ঘটনাটা বললাম।

শিউলি চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এটা লুকিয়ে ফেলো। কেউ দেখলে তোমারও বিপদ হবে, ওরও।”

“মিতা কে?”

সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

“একসময় এই বাড়িতে ছিল।”

“এখন?”

সে চোখ নামিয়ে বলল, “এই বাড়িতে কেউ কাউকে হারিয়ে গেলে, তাকে নিয়ে প্রশ্ন করা হয় না।”

আমি উত্তরটা বুঝলাম না। আবার বুঝেও ফেললাম।

আর প্রশ্ন করলাম না।

সেই রাতেই আমি কাগজটা বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখলাম। ওটাই ছিল এই শহরে আমার হাতে থাকা প্রথম সত্যিকারের প্রমাণ যে, আমার আগেও অনেক মানুষ এখানে এসে হারিয়ে গেছে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যত মানুষের নাম জানতে পারব, সব মনে রাখব।

রূপা।

শিউলি, যার আসল নাম শিউলি নয়।

রনি।

মিতা।

আমি জানতাম না, এই ছোট্ট তালিকাটা একদিন এত বড় হবে যে নামগুলো মুখস্থ রাখতে আমার নিজেরই কষ্ট হবে। কিন্তু আমি তখনই নিজের সঙ্গে একটা নীরব প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।

১০

মানুষ যখন অনেক দিন একই জায়গায় থাকে, তখন সে অজান্তেই জায়গাটার মানচিত্র মুখস্থ করে ফেলে। আমি কবে কোন সিঁড়িতে শব্দ হয়, কোন দরজার কবজায় মরিচা ধরেছে, কোন জানালার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো একটু বেশি ঢোকে, সব মনে রাখতে শুরু করলাম। এটা পালানোর পরিকল্পনা ছিল না। বরং নিজের অস্তিত্বটাকে সচল রাখার একটা উপায় ছিল। মনে হতো, আমি যদি সবকিছু মনে রাখতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন এখান থেকে বের হওয়ার পথও মনে রাখতে পারব।

রনি প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে রান্নাঘরের কাছে চলে আসত। কখনো পানি চাইত, কখনো একটা শুকনো রুটি। আমি একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বয়স কত?” সে কিছুক্ষণ আঙুল গুনতে লাগল। এক, দুই, তিন… তারপর থেমে গেল। আবার শুরু করল। আবার থামল। শেষে মাথা চুলকে বলল, “জানি না। আগে পারতাম। এখন ভুলে গেছি।”

আমি চুপ করে গেলাম।

একটা শিশুর নিজের বয়স মনে না থাকা যতটা দুঃখের, তার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হলো, সে এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে।

আমি বললাম, “তোমার গ্রামের নাম মনে আছে?”

রনি অনেকক্ষণ ভেবে বলল, “একটা নদী ছিল।”

“তারপর?”

“নদীর পাশে একটা মাঠ।”

“তারপর?”

সে মাথা নাড়ল।

“তারপর কিছু মনে নাই।”

শিউলি পরে আমাকে বলল, “ওকে আর জিজ্ঞেস কোরো না। যতবার মনে করার চেষ্টা করে, ততবার রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে।”

আমি জানালার দিকে তাকালাম। মানুষ আসলে স্মৃতি হারায় না। স্মৃতির কাছে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলে।

সেদিন বিকেলে সরদার মা সবাইকে নিচতলার বড় ঘরে ডাকলেন। আমরা সারি করে বসে রইলাম। তিনি ধীরে ধীরে আমাদের সামনে হাঁটছিলেন। কারও দিকে বেশি সময় তাকাচ্ছেন, কারও দিকে কম। তাঁর চোখে এমন এক ধরনের হিসাব ছিল, যেন তিনি মানুষ না, জিনিসপত্র গুনছেন।

হঠাৎ তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“এখানে কত দিন হলে?”

আমি বললাম, “জানি না।”

তিনি হালকা হেসে বললেন, “ভালো।”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম।

তিনি বললেন, “যেদিন মানুষ দিন গোনা বন্ধ করে দেয়, সেদিন থেকে সে এই জায়গার নিয়ম মানতে শিখে।”

আমি শান্ত গলায় বললাম, “আমি দিন গোনা বন্ধ করিনি।”

তিনি ভ্রু তুললেন।

“তাহলে?”

“আমি শুধু গুনছি না। মনে রাখছি।”

কথাটা শুনে তাঁর মুখের হাসিটা এক মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। খুব অল্প সময়। কিন্তু আমি দেখেছিলাম।

তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেলেন।

শিউলি পরে আমার কাছে এসে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “ওনার সঙ্গে তর্ক কোরো না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “উনি কি সবসময় এমন?”

শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“না। আজ উনি তোমাকে দেখে ভাবছিলেন।”

“কী ভাবছিলেন?”

“তুমি কত দিনে ভাঙবে।”

রাতে ঘুম আসছিল না। বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা মিতার চিরকুটটা বের করলাম। কাগজটা কয়েকবার পড়তে পড়তে মনে হলো, এটা শুধু একটা বার্তা নয়। এটা একটা দায়িত্ব।

আমি খুব ছোট্ট করে চিরকুটের পেছনে লিখলাম,

“রূপা। কাশিপুর। মা অপেক্ষা করছেন।”

তারপর আবার ভাঁজ করে রেখে দিলাম।

কেন লিখেছিলাম, জানি না।

হয়তো এই ভয় থেকে, যদি কোনোদিন আমিও হঠাৎ হারিয়ে যাই, তাহলে কেউ অন্তত জানুক, আমারও একটা নাম ছিল। আমিও কোনো এক গ্রামের মেয়ে ছিলাম। আমার জন্যও একজন মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

সেই রাতেই প্রথমবার আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল।

এই বাড়ির ভেতরে কি শুধু বন্দিরাই আছে?

নাকি এমনও কেউ আছে, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক মানুষের মতো বেঁচে থাকে, অথচ ভেতরে ভেতরে এই অন্ধকারেরই অংশ?

১১

সকালের দিকে গেট খুলে একজন মাঝবয়সী মানুষ ভেতরে ঢুকলেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো একটা কাপড়ের ব্যাগ। হাতে ওষুধের বাক্স। বাড়ির সবাই তাকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই নিজের কাজে ব্যস্ত রইল। মনে হলো, তিনি নতুন কেউ নন। নিয়মিতই আসেন।

আমি রান্নাঘরের দরজার আড়াল থেকে দেখছিলাম।

লোকটা ভেতরে ঢুকেই চারপাশে একবার তাকালেন। তারপর চোখ নামিয়ে ফেললেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি কোনো মেয়ের মুখের দিকে একবারও তাকালেন না। যেন ইচ্ছে করেই দৃষ্টি সরিয়ে রাখছেন।

আমি শিউলিকে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, “উনি কে?”

শিউলি কাজ করতে করতেই বলল, “ডাক্তার না। তবে সবাই ডাক্তার সাহেব বলে ডাকে।”

“তিনি কি জানেন এখানে কী হচ্ছে?”

শিউলি উত্তর দিল না।

উত্তর না দেওয়াটাই অনেক সময় সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর।

কিছুক্ষণ পর একজন একজন করে সবাইকে পাশের ছোট ঘরে ডাকা হলো। কারও জ্বর, কারও কাশি, কারও মাথাব্যথা। লোকটা খুব কম কথা বলছিলেন। প্রয়োজন ছাড়া একটি শব্দও না।

আমার ডাক পড়লে আমি ভেতরে ঢুকলাম। তিনি টেবিলে বসে একটা খাতায় লিখছিলেন।

“বসো।”

আমি বসলাম।

তিনি আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জ্বর আছে?”

“না।”

“খেতে পারছ?”

আমি উত্তর না দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি এবার প্রথমবারের মতো চোখ তুললেন।

সেই চোখে আমি যা দেখলাম, তা ভয় না, নিষ্ঠুরতাও না।

ক্লান্তি।

গভীর, বহু বছরের ক্লান্তি।

আমি খুব আস্তে বললাম, “আপনি কি আমাকে এখান থেকে বের করে নিতে পারবেন?”

লোকটার হাতে ধরা কলম থেমে গেল।

ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা।

তারপর তিনি এমনভাবে আবার লিখতে শুরু করলেন, যেন কিছুই শোনেননি।

আমি আবার বললাম, “শুনতে পেয়েছেন?”

তিনি নিচু গলায় বললেন, “এখানে এমন কথা বলো না।”

“কেন?”

“কারণ দেয়ালেরও কান আছে।”

আমি হতাশ হয়ে চুপ করে গেলাম।

কিছুক্ষণ পরে তিনি একটা সাধারণ ভিটামিনের পাতা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি সেটা নিতে গিয়ে দেখলাম, ওষুধের পাতার নিচে খুব ছোট্ট একটা কাগজ ভাঁজ করা।

আমি অবাক হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করলাম না।

তিনি শান্ত গলায় বললেন, “নিয়ম করে খাবে।”

আমি মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলাম।

সারাদিন বুক ধড়ফড় করছিল। কাগজটা খোলার সুযোগই পাচ্ছিলাম না। অবশেষে গভীর রাতে, সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলে, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা অল্প আলোয় ভাঁজটা খুললাম।

মাত্র একটি লাইন লেখা।

“কাউকে বিশ্বাস কোরো না। আমাকে-ও না।”

আমি কয়েকবার পড়ে নিশ্চিত হলাম, ঠিকই পড়েছি।

“আমাকে-ও না।”

আমার মাথা ঘুরে গেল।

যে মানুষটা আমাকে গোপনে এই কাগজ দিলেন, তিনিই আবার লিখলেন তাকে বিশ্বাস না করতে।

কেন?

তিনি কি ভয় পাচ্ছেন?

নাকি তিনিও এই অন্ধকারেরই একজন?

পরদিন যখন তিনি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, দূর থেকে দেখলাম গেট পর্যন্ত সরদার মা নিজে তাকে এগিয়ে দিচ্ছেন। দুজনের মধ্যে খুব স্বাভাবিক কথাবার্তা হচ্ছে। এমনভাবে কথা বলছেন, যেন বহু দিনের পরিচয়।

আমি তখন বুঝলাম, এই বাড়ির সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টা শুধু বন্ধ দরজা নয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, এখানে কে শত্রু আর কে বন্ধু, সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই।

সেদিন রাতে বালিশের নিচে দুটি কাগজ পাশাপাশি রেখে দিলাম।

একটাতে লেখা, “আমার নাম মিতা…”

আরেকটাতে লেখা, “কাউকে বিশ্বাস কোরো না। আমাকে-ও না।”

দুটি ছোট্ট কাগজ।

১২

সেদিনের পর আমি মানুষকে আর আগের মতো দেখতাম না। কেউ একটু ভালো ব্যবহার করলেই মনে হতো, এর ভেতরেও নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। আবার কেউ কঠিন কথা বললেও ভাবতাম, হয়তো সে নিজের ইচ্ছায় এমন নয়। এই বাড়িতে কয়েকটা দিন কাটানোর পর একটা জিনিস বুঝেছিলাম, এখানে কেউ নিজের আসল মুখ নিয়ে বাঁচে না। কেউ ভয় লুকিয়ে রাখে, কেউ অপরাধবোধ, কেউ অসহায়ত্ব, আর কেউ লুকিয়ে রাখে নিজের অতীত।

দুপুরের দিকে রান্নাঘরের পেছনের উঠোনে কাপড় শুকাতে দিতে গিয়ে প্রথমবার তার সঙ্গে পরিচয় হলো। বয়স আমার চেয়ে একটু বেশি হবে। খুব রোগা, গায়ের রং শ্যামলা, চুল কোমর পর্যন্ত লম্বা। সে কাপড় মেলতে মেলতে খুব আস্তে একটা পুরোনো লোকগান গুনগুন করছিল। এত আস্তে যে শব্দগুলো ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু সুরটা শুনেই আমার গ্রামের কথা মনে পড়ে গেল। নদীর ধারে বিকেলে মাঝিদের মুখে এমন সুর শুনেছিলাম।

আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম।

হঠাৎ সে গান থামিয়ে আমার দিকে তাকাল।

“কী হলো?”

আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, “তুমি খুব সুন্দর গাও।”

মেয়েটা মৃদু হেসে বলল, “আগে গাইতাম। এখন শুধু মনে রাখার জন্য গাই।”

“কী মনে রাখার জন্য?”

সে আকাশের দিকে তাকাল।

“বাড়ির পথ।”

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না।

সে নিজেই বলল, “যেদিন থেকে এখানে এসেছি, ভয় হয় কোনোদিন যদি নিজের গ্রামের শব্দটাই ভুলে যাই। তাই মাঝে মাঝে গান গাই। সুরের ভেতর কিছু স্মৃতি লুকিয়ে থাকে।”

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম?”

সে একটু থেমে বলল, “এখানে সবাই আমাকে নীলা বলে ডাকে।”

আমি হেসে বললাম, “আসল নাম?”

সে হাসল না।

বরং ধীরে মাথা নাড়ল।

“অনেক দিন কেউ ওই নামে ডাকেনি। এখন শুনলেও হয়তো বুঝব না আমাকে ডাকছে।”

তার কথায় আমার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। মানুষকে মেরে ফেলতে সবসময় অস্ত্র লাগে না। কখনো কখনো শুধু তার নামটা কেড়ে নিলেই হয়।

সেদিন বিকেলে আমরা কয়েকজন মিলে চাল বাছছিলাম। কাজের ফাঁকে নীলা খুব আস্তে বলল, “তুমি এখনো রাতে কাঁদো?”

আমি একটু অবাক হলাম।

“তুমি জানো?”

সে মুচকি হেসে বলল, “এই বাড়িতে কান্না লুকানো যায় না। শুধু শব্দটা লুকানো যায়।”

আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কাঁদো?”

সে চালের ভেতর থেকে একটা ছোট পাথর আলাদা করতে করতে বলল, “একসময় কাঁদতাম। এখন গান গাই।”

আমার মনে হলো, এই মেয়েটা হয়তো অন্যদের চেয়ে শক্ত।

কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে গেল কয়েক মিনিট পরেই।

রনি দৌড়ে এসে নীলাকে জড়িয়ে ধরল।

“আপা, আজ রাতে আবার ওই গল্পটা বলবা?”

নীলা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কোন গল্প?”

“যে গল্পে নদী আছে।”

“আচ্ছা বলব।”

রনি চলে যাওয়ার পর আমি বললাম, “ওকে তুমি গল্প বলো?”

নীলা খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, “ওরা যেন অন্তত স্বপ্নে একটা পৃথিবী দেখে।”

“তুমি?”

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমি গল্প বলি, কারণ আমি ভয় পাই, যদি ওরা সত্যিটাই শুধু মনে রাখে, তাহলে বড় হয়ে মানুষ থাকতে পারবে না।”

সেদিন রাতে ঘুম আসছিল না। করিডোরের ওপাশ থেকে খুব আস্তে নীলার গলার সুর ভেসে আসছিল। সে নিশ্চয়ই রনিদের গল্প বলছিল। শব্দগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না, শুধু মাঝে মাঝে “নদী”, “নৌকা”, “কদমগাছ”, “বৃষ্টি” শব্দগুলো ভেসে আসছিল।

আমি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলাম, রনি হয়তো কোনোদিন সেই নদী দেখেইনি। তবু সে সেই নদীর স্বপ্ন দেখছে।

হয়তো মানুষ বেঁচে থাকে রুটিতে নয়।

একটা গল্পেও মানুষ কয়েকটা বছর টিকে থাকতে পারে।

১৩

সেদিন দুপুর থেকে বাড়িটার ভেতরের পরিবেশ অন্য রকম লাগছিল। কেউ জোরে কথা বলছিল না। রান্নাঘরে কাজ চলছে, করিডোরে লোকজন হাঁটছে, উঠোন ঝাঁট দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সবকিছু যেন অদ্ভুত এক নীরবতার মধ্যে। এই নীরবতা আমি আগে দেখেছি। যেদিন আমাকে এখানে আনা হয়েছিল, সেদিনও এমনই ছিল। তখন বুঝিনি। এখন বুঝি, এই নীরবতা কোনো শান্তির নয়। এটা ঝড়ের আগের নীরবতা।

শিউলি ভাত ধুতে ধুতে আমার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল, “আজ নতুন মেয়ে আসবে।”

আমি হাতের কাজ থামিয়ে বললাম, “তুমি কীভাবে জানো?”

সে মৃদু হাসল। “এখানে কিছুদিন থাকলে বুঝতে শিখে যাও। যেদিন নতুন কাউকে আনা হয়, সেদিন সবাই একটু বেশি চুপচাপ থাকে।”

আমি আর কিছু বললাম না। বুকের ভেতর অকারণে একটা অস্বস্তি জমতে লাগল। মনে হচ্ছিল, অনেক দূরের কোনো স্মৃতি ধীরে ধীরে আমার দিকে হেঁটে আসছে।

বিকেলের একটু আগে গেটের বাইরে একটি বাসের হর্ন শোনা গেল। এই বাড়িতে সাধারণত মাইক্রোবাস আসত। তাই শব্দটা শুনেই আমি জানালার সরু ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করলাম। রাস্তার ওপাশে একটি দূরপাল্লার বাস থেমেছে। কয়েকজন যাত্রী নামছে। তাদের ভিড়ের মধ্য থেকে একজন যুবক একটি মেয়েকে নিয়ে ধীরে ধীরে এই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।

মেয়েটির বয়স খুব বেশি হলে ষোলো হবে। কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ। চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে এখনো আশাবাদী। হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেখছে। ঠিক যেমন আমি দেখেছিলাম।

গেট খুলে দেওয়া হলো।

মেয়েটি ভেতরে ঢুকেই চারদিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “অফিসটা কি এইখানে?”

আমার বুকের ভেতর যেন কেউ শক্ত করে আঘাত করল।

এই একই প্রশ্ন আমিও করেছিলাম।

একই বিস্ময়।

একই বিশ্বাস।

একই অজানা ভবিষ্যৎ।

কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। একজন লোক শুধু বলল, “আগে ভেতরে আসো। তারপর সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”

মেয়েটি কোনো সন্দেহ করল না। সে ধীরে ধীরে লোকগুলোর সঙ্গে হাঁটতে লাগল। হয়তো তার মনেও এখন ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন। হয়তো সে ভাবছে, কয়েক মাস পরে মায়ের হাতে টাকা তুলে দেবে। হয়তো ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচ দেবে। হয়তো বাবার ঋণ শোধ করবে।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।

মনে হচ্ছিল, আমি নিজের অতীতকে আবার হাঁটতে দেখছি।

শিউলি এসে আমার পাশে দাঁড়াল।

খুব নিচু গলায় বলল, “আজ রাতটা ওর সবচেয়ে কঠিন রাত হবে।”

আমি বললাম, “আমরা কি ওকে কিছু বলতে পারি না?”

শিউলি ধীরে মাথা নাড়ল।

“পারি না। ওকে এখনই সত্যিটা বললে ও বিশ্বাস করবে না। আমরা সবাই প্রথম দিন সত্যি কথাকেই মিথ্যা ভেবেছিলাম।”

কিছুক্ষণ পরে করিডোরের শেষ মাথার ঘরটায় দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

তারপর তালা।

টক…

আমার শরীর কেঁপে উঠল।

এই শব্দটা যেন এই বাড়ির আসল পরিচয়। বাইরে থেকে এটা একটা সাধারণ বাড়ি। ভেতরে এটা মানুষের স্বপ্ন আটকে রাখার কারাগার।

রাত নেমে আসার বেশি দেরি হলো না।

খাবার শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই করিডোরে কান্নার শব্দ ভেসে এল।

“দরজাটা খুলে দেন… আমি এখানে থাকব না… আমার আম্মুকে ফোন করতে দেন… আমি বাড়ি চলে যাব…”

প্রতিটি শব্দ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল।

আমি দরজার পাশে বসে পড়লাম।

চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো, কয়েক সপ্তাহ আগের সেই রাতটা আবার ফিরে এসেছে। আমিও ঠিক এভাবেই দরজায় ধাক্কা মেরে চিৎকার করেছিলাম। আমারও বিশ্বাস ছিল, একটু পরেই সোহেল ফিরে আসবে।

সে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি।

শিউলি ধীরে ধীরে দেয়ালের কাছে গিয়ে তিনবার টোকা দিল।

টক…

টক…

টক…

কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

তারপর ওপাশ থেকে ভাঙা গলায় প্রশ্ন এল।

“আপা… আমি কোথায় এসেছি?”

আমাদের দুজনের কেউই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলাম না।

অনেকক্ষণ পরে শিউলি শুধু বলল, “তুমি একা না।”

ওপাশে আবার কান্না শুরু হলো।

আমি দেয়ালে হাত রেখে বসে রইলাম। আমার খুব ইচ্ছে করছিল বলে দিই, এই বাড়ি কোনো অফিস নয়। এখানে চাকরি নেই। এখানে মানুষকে আটকে রাখা হয়। তারপর একদিন দালালরা এসে মেয়েদের কিনে নিয়ে যায়। তাদের জোর করে এমন জায়গায় পাঠানো হয়, যেখানে তাদের ইচ্ছা, সম্মান, পরিচয়, সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই বাড়ি আসলে সেই ভয়াবহ মানবপাচার চক্রের একটি অন্ধকার অপেক্ষার ঘর।

কিন্তু আমি কিছুই বললাম না।

কারণ আমি জানতাম, সত্যিটা এত ভয়ংকর যে প্রথম রাতে কেউ তা বিশ্বাস করতে পারে না।

আমি শুধু দেয়ালে হাত রেখে খুব আস্তে বললাম,

“তোমার নামটা মনে রেখো। যা-ই হোক, নিজের নামটা কখনো ভুলে যেও না।”

ওপাশ থেকে ফোঁপানোর শব্দের মাঝেই উত্তর এল।

“আমার নাম… সাবিহা।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

মনের ভেতর নিঃশব্দে আরেকটি নাম যোগ হয়ে গেল।

রূপা।

শিউলি।

নীলা।

রনি।

মিতা।

আর এখন…

সাবিহা।

১৪

সাবিহাকে আনার পর বাড়িটার ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে গেল। নতুন কেউ এলে প্রথম কয়েক দিন পুরো বাড়ির পরিবেশ বদলে যেত। পুরোনো মেয়েরা কম কথা বলত। কারণ তারা জানত, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর একসময় তারা খুঁজেছিল, এখন সেগুলোই নতুন মেয়েটি করবে। আর সেই উত্তরগুলো কারও কাছেই সহজ ছিল না।

সাবিহা প্রথম দুই দিন প্রায় কিছুই খেল না। সারাক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত। কোনো পায়ের শব্দ হলেই উঠে দাঁড়াত। মনে হতো, এই বুঝি কেউ এসে বলবে, সব ভুল হয়েছে। তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে।

তৃতীয় দিনের সকালে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “আপা, ওরা বলছে কয়েক দিনের মধ্যে আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে। কেন?”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

সে আবার বলল, “ওরা কি সত্যি চাকরি দেবে?”

আমার গলা শুকিয়ে গেল।

আমি জানতাম, মিথ্যা বললে তাকে কয়েক ঘণ্টার শান্তি দেওয়া যাবে। কিন্তু সত্যিটা না বললে হয়তো তাকে বাঁচানোর শেষ সুযোগটাও হারিয়ে যাবে।

আমি খুব আস্তে বললাম, “তোমাকে যে চাকরির কথা বলা হয়েছিল, সেটা মিথ্যা ছিল।”

সাবিহা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।

“তাহলে?”

আমি চারদিকে একবার তাকালাম। কেউ শুনছে কি না নিশ্চিত হয়ে আরও নিচু গলায় বললাম, “এই বাড়িটা শেষ জায়গা না। এটা মাঝের জায়গা। এখানে কিছু দিন আটকে রাখে। তারপর মানুষ আসে। টাকা দিয়ে মেয়েদের নিয়ে যায়।”

সে বুঝতে পারল না।

“কোথায় নিয়ে যায়?”

আমার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“যেখানে মেয়েদের ইচ্ছার কোনো দাম থাকে না। জোর করে যৌন শোষণের জন্য। বিভিন্ন পতিতালয় আর এমন সব জায়গায়, যেখান থেকে অনেকেই আর কোনোদিন নিজের জীবনে ফিরতে পারে না।”

কথাগুলো বলার সময় মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন আমার নিজের বুকেও আঘাত করছে।

সাবিহা প্রথমে স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর মাথা নাড়তে শুরু করল।

“না… না… এটা হতে পারে না।”

আমি কিছু বললাম না।

সে আমার দুই হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

“আপা, তুমি মিথ্যা বলছ, তাই না? আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?”

আমার চোখে পানি চলে এল।

“আমিও প্রথম দিন বিশ্বাস করিনি।”

সাবিহা হঠাৎ উঠে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। দুই হাতে দরজায় আঘাত করতে লাগল।

“দরজা খুলেন… আমাকে যেতে দেন… আমার আব্বা আসবে… আপনারা ভুল করছেন…”

করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, “চুপচাপ থাকো।”

সাবিহা থামল না।

কয়েক মিনিট পরে সরদার মা নিজে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি দরজা খুললেন না।

শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন, “চিৎকার করে লাভ নেই।”

সাবিহা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আপনি আমারে ছাড়েন। আমার মা জানে না আমি এখানে।”

সরদার মা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“এখানে যারা আসে, তাদের মায়েরাও জানে না তারা কোথায়।”

এই কথাটা তিনি এমন স্বাভাবিকভাবে বললেন, যেন আবহাওয়ার খবর বলছেন।

তিনি চলে যাওয়ার পর পুরো করিডোর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

রাতে শিউলি আমাকে বলল, “আজ নিচতলায় তিনজন লোক এসেছিল।”

“কারা?”

“দালাল।”

আমি চমকে উঠলাম।

“তুমি দেখেছ?”

সে মাথা নেড়ে বলল।

“ওরা আসে। মেয়েদের দেখে। তারপর কয়েক দিন পরে যাদের পছন্দ করে, তাদের নিয়ে যায়।”

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কোথায়?”

শিউলি চোখ বন্ধ করল।

“বাংলাদেশের বিভিন্ন পতিতালয়ে। আবার কাউকে অন্য শহরে, কাউকে সীমান্ত পেরিয়েও পাচার করে। আমরা সবাই জানি। কিন্তু কেউ কাউকে বাঁচাতে পারি না।”

আমি দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।

হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এই বাড়ির করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মেয়েই যেন একটি অপেক্ষার তালিকায় নাম লেখা মানুষ।

তারা অপেক্ষা করছে মুক্তির জন্য নয়।

বরং অপেক্ষা করছে, কবে তাদের নাম ডাকা হবে।

আর সেই দিনই তাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হবে।

সেদিন রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি।

প্রথমবার আমার মনে শুধু পালানোর কথা আসেনি।

আমার মনে হয়েছিল, যদি আমি কোনোদিন এখান থেকে বের হতে পারি, তাহলে এই পুরো চক্রটাকে পৃথিবীর সামনে আনব।

কারণ মানুষ যদি জানেই না এই অপরাধ কীভাবে ঘটে, তাহলে আর কত সাবিহা, কত রূপা, কত অচেনা মেয়ের জীবন এভাবেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?

১৫

সাবিহার আসার পর পাঁচ দিন কেটে গেল। এই পাঁচ দিনে মেয়েটার মুখ বদলে গেল। প্রথম দিন যে চোখে ভয় ছিল, এখন সেখানে শুধু অবিশ্বাস। সে আর বারবার দরজায় ধাক্কা দেয় না। শুধু সুযোগ পেলেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “আপা, কেউ কি কখনো এখান থেকে ফিরে গেছে?”

প্রথম কয়েকবার আমি উত্তর দিইনি।

তারপর একদিন বললাম, “জানি না।”

আসলে আমি জানতাম না বলেই বলেছিলাম। কারণ এই বাড়িতে যারা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যেত, তাদের নিয়ে আর কেউ কথা বলত না। যেন তারা কোনোদিন ছিলই না।

সেদিন বিকেলে নিচতলার ঘরে সবাইকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। এমনটা মাঝেমধ্যে হতো। কারণ না জেনেই আমাদের বসে থাকতে হতো। সরদার মা সামনে বসে খাতা দেখছিলেন। তাঁর পাশে দুইজন অপরিচিত লোক। দুজনের পোশাক-আশাক দেখে সাধারণ ব্যবসায়ী মনে হয়। একজনের হাতে দামি ঘড়ি। আরেকজন বারবার মোবাইল দেখছে। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না, তারা মানুষ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত।

তারা একে একে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল।

সেই দৃষ্টিটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারিনি।

ওটা মানুষের দিকে তাকানোর দৃষ্টি ছিল না।

যেন বাজারে পশু কেনার আগে দেখে নেওয়া হচ্ছে।

আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।

শিউলি খুব আস্তে আমার হাত চেপে ধরল।

“চোখ নিচু করে রাখো।”

আমি ফিসফিস করে বললাম, “ওরা কারা?”

সে ঠোঁট নাড়ল।

“যাদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না, অথচ ওরাই আসে।”

অনেকক্ষণ ধরে তারা নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথা বলল। তারপর একজন সরদার মার কানে কিছু বলল। সরদার মা খাতায় চোখ বুলিয়ে তিনটি নাম ডাকলেন।

“মৌ।”

ঘরের এক কোণে বসা মেয়েটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“রিনা।”

আরেকজন উঠে দাঁড়াল।

তারপর…

“নীলা।”

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।

নীলা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো কান্না নেই। কোনো চিৎকার নেই। শুধু একবার আমাদের দিকে তাকাল।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

ঘরের ভেতর সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা নেমে এল।

সরদার মা ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকালেন।

“বসে পড়ো।”

আমি দাঁড়িয়েই রইলাম।

“ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

তিনি এবার আরও ঠান্ডা গলায় বললেন, “যেখানে ওর যাওয়ার কথা।”

আমি বললাম, “ও যেতে চায় না।”

নীলা তখন খুব আস্তে বলল, “রূপা…”

আমি তার দিকে তাকালাম।

সে মাথা নাড়ল।

“আর কিছু বলো না।”

আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন সে আমাকে থামাচ্ছে।

দুজন লোক নীলাকে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। যাওয়ার সময় রনি দৌড়ে এসে তার কাপড় আঁকড়ে ধরল।

“আপা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

নীলা হাঁটু গেড়ে বসে রনির মাথায় হাত রাখল। অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না।

শেষ পর্যন্ত শুধু বলল, “গল্পগুলো মনে রাখিস।”

রনি শিশুর মতো সরল গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার আসবা তো?”

নীলা উত্তর দিল না।

সে শুধু রনিকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

আমি স্পষ্ট দেখলাম, এত দিন পরে প্রথমবার নীলার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

কয়েক সেকেন্ড পরে লোকগুলো তাকে টেনে নিয়ে গেল।

গেট খুলল।

গেট বন্ধ হলো।

তারপর সব শেষ।

সেই রাতে করিডোরে কোনো গান শোনা গেল না।

রনি বারবার রান্নাঘরের দিকে এসে জিজ্ঞেস করছিল, “নীলা আপা কই?”

কেউ উত্তর দিচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত সে আমার কাছে এসে বলল, “আপা, নীলা আপা কি রাগ করছে?”

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

একটা শিশুকে কীভাবে বোঝাই, যে মানুষটা তাকে নদীর গল্প শোনাত, তাকে এমন এক অন্ধকারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে খুব কম মানুষই নিজের জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারে?

আমি শুধু তাকে কোলে তুলে নিলাম।

রনি আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

সেই রাতে আমি আর ঘুমাতে পারিনি।

নীলার খালি বিছানার দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল।

আজ নীলা গেল।

কাল হয়তো সাবিহা যাবে।

একদিন আমার নামও ডাকা হবে।

১৬

নীলা চলে যাওয়ার পর বাড়িটার ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এল। মানুষের অনুপস্থিতিও যে শব্দ করে, সেটা আমি সেদিন বুঝেছিলাম। রান্নাঘরের কোণে আর কেউ গুনগুন করে গান গায় না। সন্ধ্যার পরে রনি আর নদীর গল্প শোনার জন্য কাউকে খুঁজে পায় না। কাপড় শুকানোর দড়িতে একটা ওড়না কম ঝুলে থাকে। অথচ কেউ নীলার নাম উচ্চারণ করে না। যেন এই বাড়ির নিয়মই হলো, যে চলে যাবে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যেতে হবে।

কিন্তু আমি ভুলিনি।

সেদিন রাতে বালিশের নিচে রাখা কাগজের টুকরোটা বের করলাম। মিতার নামের নিচে ছোট করে লিখলাম, “নীলা।” তার আসল নাম আমি জানতাম না। তবু লিখলাম। কারণ পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও হয়তো তার মা এখনো তাকে অন্য নামে ডাকছেন।

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই করিডোরে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা টের পেলাম। কয়েকজন লোক এদিক-ওদিক হাঁটছে। সরদার মার ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে নিচু গলায় কথা হচ্ছে। আমি পানি আনতে যাওয়ার সময় শুনতে পেলাম একজন বলছে, “আজ বিকেলের আগেই গাড়ি আসবে।”

আরেকজন উত্তর দিল, “তিনজন প্রস্তুত আছে।”

আমার বুক ধক করে উঠল।

“তিনজন।”

এই শব্দটার মানে এখন আমি জানি।

দুপুরের কিছু আগে সরদার মা সবাইকে বড় ঘরে ডাকলেন। তাঁর হাতে সেই পুরোনো খাতাটা। তিনি ধীরে ধীরে পাতা উল্টাচ্ছিলেন। ঘরের ভেতর এমন নীরবতা যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।

তিনি প্রথম নামটা ডাকলেন।

“মৌ।”

মেয়েটি মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো পানি নেই। মনে হলো, কান্নাও একসময় মানুষকে ছেড়ে চলে যায়।

দ্বিতীয় নাম।

“সাবিহা।”

শব্দটা শুনেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সাবিহা যেন বুঝতেই পারল না। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর কাঁপা গলায় বলল, “আমাকে?”

সরদার মা মাথা তুললেন না।

“হ্যাঁ।”

সাবিহা উঠে দাঁড়িয়েই আমার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই একই প্রশ্ন, যার উত্তর আমার কাছে নেই।

“আপা…”

শুধু এই একটি শব্দ।

তারপর সে কেঁদে ফেলল।

“আমাকে বাঁচান। আমি যামু না। আমি ওইখানে যামু না।”

ঘরের কেউ মাথা তুলল না। সবাই যেন নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিল।

দুজন লোক এগিয়ে এসে সাবিহার পাশে দাঁড়াল।

সে হঠাৎ আমার দিকে দৌড়ে এল। দুই হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“আপা, আমারে ছাড়াইয়েন না।”

আমি তাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার দুই হাত কাঁপছিল।

আমি জানতাম, যদি এখন কিছু করি, তাহলে হয়তো আমাকেও সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলবে। আবার কিছু না করলে, সাবিহাকে এমন এক অন্ধকারে পাঠানো হবে, যেখান থেকে তার জীবন আর কখনো আগের মতো হবে না।

আমি সরদার মার দিকে তাকিয়ে বললাম, “ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

তিনি শান্ত গলায় বললেন, “যেখানে ওর নতুন কাজ।”

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।

“মিথ্যা বলবেন না। আপনারা ওকে কাজে পাঠাচ্ছেন না। আপনারা ওকে বিক্রি করে দিচ্ছেন।”

ঘরের বাতাস মুহূর্তেই জমে গেল।

কেউ কোনোদিন সরদার মার সামনে এভাবে কথা বলেনি।

তিনি ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আমার সামনে এসে থামলেন।

“এই কথা কে শিখিয়েছে?”

আমি উত্তর দিলাম, “আপনাদের কাজই শিখিয়েছে।”

তিনি আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর আশ্চর্যজনকভাবে আমাকে মারলেন না। শুধু পাশে দাঁড়ানো লোকদের বললেন, “ওকে আলাদা ঘরে রাখো।”

দুজন লোক আমাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।

আমি শেষবারের মতো পেছন ফিরে দেখলাম।

সাবিহা কাঁদছে।

রনি ভয়ে কোণে দাঁড়িয়ে আছে।

শিউলি মাথা নিচু করে চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছে।

আর সরদার মা আবার খাতা খুলে বসেছেন।

যেন কিছুই হয়নি।

সেদিন আমাকে বাড়ির একেবারে ওপরের তলার একটি ছোট ঘরে আটকে রাখা হলো। জানালাটা আগেরগুলোর চেয়ে একটু উঁচু। অনেক কষ্টে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালাম।

বিকেলের দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে গেটের সামনে থামল।

কয়েক মিনিট পরে গেট খুলল।

তিনজন মেয়েকে বের করে আনা হলো।

তাদের মধ্যে একজন সাবিহা।

সে একবার মাথা তুলে বাড়িটার দিকে তাকাল।

আমি জানি না, সে আমাকে দেখেছিল কি না।

কিন্তু আমি তাকে দেখেছিলাম।

গাড়ির দরজা বন্ধ হলো।

মাইক্রোবাস ধীরে ধীরে রাস্তায় মিলিয়ে গেল।

১৭

ওপরের ছোট ঘরটায় আমাকে কত দিন আটকে রাখা হয়েছিল, সেটা পরে আর ঠিক মনে করতে পারিনি। এখানে সময়ের কোনো হিসাব ছিল না। জানালার সরু ফাঁক দিয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যেত, সূর্যের ওঠানামা দেখে শুধু দিন গুনতাম। প্রথম দিন দেয়ালে নখ দিয়ে একটি দাগ কেটেছিলাম। পরে দেখি, দেয়াল দাগে ভরে যাচ্ছে, কিন্তু আমার মুক্তি আসছে না।

সাবিহাকে নিয়ে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটাই যেন বদলে গেছে। করিডোরে আর তার কণ্ঠ শোনা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হতো, নিচে কেউ কাঁদছে। তারপর বুঝতাম, ওটা অন্য কেউ। এই বাড়িতে কান্নারও কোনো আলাদা পরিচয় নেই। একসময় সব কান্নার শব্দ একই রকম হয় যায়।

এক বিকেলে দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো। আমি ভেবেছিলাম খাবার দিতে এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সেই ডাক্তার, যিনি একদিন কাগজে লিখে দিয়েছিলেন, “কাউকে বিশ্বাস কোরো না। আমাকে-ও না।”

তিনি হাতে একটা ট্রে নিয়ে ঢুকলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জ্বর আছে। ওষুধ খাইয়ে বের হচ্ছি।”

লোকটা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

ডাক্তার ভেতরে এসে খুব আস্তে বললেন, “সময় কম।”

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি ট্রের নিচ থেকে ভাঁজ করা ছোট্ট একটা কাগজ বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন।

“এখন খুলবে না।”

আমি কিছু বলার আগেই তিনি স্বাভাবিক গলায় বলতে শুরু করলেন, “ওষুধ নিয়ম করে খাবে। না হলে জ্বর নামবে না।”

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার যেন কোনো সন্দেহ না হয়, সেই জন্য তিনি জোরে জোরে সাধারণ রোগীর মতো কথাবার্তা বলতে লাগলেন। কয়েক মিনিট পরে তিনি বেরিয়ে গেলেন।

দরজা আবার বন্ধ হলো।

তালা পড়ার শব্দ শোনা গেল।

আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেলে কাগজটা খুললাম।

ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন।

“বাড়ির উত্তর পাশের পুরোনো গুদামঘরে সপ্তাহে একবার মেয়েদের রাখা হয়। সব গাড়ি সেখান থেকেই ছাড়ে। বাইরে একজন পুলিশ নিয়মিত টাকা নেয়। সবাই জড়িত না। একজন সৎ মানুষ খুঁজে বের করতে হবে।”

আমার হাত কাঁপতে লাগল।

এটাই প্রথমবার।

প্রথমবার আমি বুঝলাম, এই অন্ধকারের বাইরেও কেউ আছে, যে সবকিছু দেখছে।

কাগজের নিচে আরও একটি লাইন ছিল।

“পরের বৃহস্পতিবার রাত। প্রস্তুত থাকো।”

আমি বারবার লাইনটা পড়তে লাগলাম।

এটা কি ফাঁদ?

নাকি সত্যিই কোনো সুযোগ?

মিতার কথাটা মনে পড়ল।

“কাউকে বিশ্বাস কোরো না।”

আবার ডাক্তারের কথাও মনে পড়ল।

“আমাকে-ও না।”

আমি কাগজটা ছিঁড়ে ছোট ছোট টুকরো করলাম। তারপর জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিলাম।

কিন্তু শেষ লাইনটা আমার মাথা থেকে আর উড়ে গেল না।

“পরের বৃহস্পতিবার রাত।”

সেই রাতেই অনেক দিন পরে প্রথমবার আমার মনে হলো, হয়তো পালানোর সুযোগ সত্যিই আসতে পারে।

১৮

বৃহস্পতিবার আসতে যেন শেষই হচ্ছিল না। প্রতিটি দিন আমার কাছে একেকটা বছরের মতো লাগছিল। সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হতো, আজ কি সেই দিন? তারপর সূর্যের আলো জানালার গ্রিল বেয়ে ধীরে ধীরে সরে যেত। বিকেল হতো, সন্ধ্যা নামত, আবার রাত। কিন্তু কিছুই ঘটত না। অপেক্ষা মানুষকে যেমন ধৈর্য শেখায়, তেমনি ভেতর থেকে ভেঙেও দেয়। আমি বুঝতে পারছিলাম, এই কয়েক দিনে আমি দুটো কাজই শিখে ফেলেছি।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়িটার ভেতরে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা শুরু হলো। নিচতলায় বারবার দরজা খোলার শব্দ, মানুষের পায়ের শব্দ, নিচু গলায় কথাবার্তা। আমার ঘরের দরজা তখনও বন্ধ। কিন্তু অনেক দিন ধরে এই বাড়িতে থাকতে থাকতে শব্দ দিয়েই আমি বুঝতে শিখেছি কোনটা রান্নাঘরের হাঁড়ি নামানোর আওয়াজ, কোনটা তালা খোলার, আর কোনটা গাড়ি এসে থামার শব্দ।

রাত একটু গভীর হতেই দরজার বাইরে পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“খাবার।”

আমি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।

দরজা খুলতেই দেখি ট্রেটা হাতে রনি। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির এক লোক। রনি মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে ট্রেটা মেঝেতে রেখে দিল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার আমার দিকে তাকাল। সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা আগে কখনো দেখিনি। ভয়, আশা আর তাড়াহুড়ো, সব একসঙ্গে মিশে আছে।

লোকটা বলল, “তাড়াতাড়ি বের হও।”

রনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল।

দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

আমি ট্রেটা হাতে তুলতেই শুকনো রুটিটার ভেতর অস্বাভাবিক শক্ত কিছু অনুভব করলাম। সাবধানে ভেঙে দেখি, ভেতরে খুব ছোট্ট করে ভাঁজ করা একটি কাগজ।

আমার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল।

কাগজটা খুললাম।

লেখা মাত্র তিনটি বাক্য।

“আজ রাত।”

“উত্তরের গুদাম।”

“শিউলিকে রেখে যেও না।”

আমি দীর্ঘক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

একাই পালানো হয়তো সম্ভব।

দুজন হলে কঠিন।

আর যদি রনিকেও সঙ্গে নিতে চাই…

তাহলে প্রায় অসম্ভব।

এই বাড়িতে প্রথম দিন আসার সময় আমি শুধু নিজের বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমি আর আগের সেই রূপা নেই। শুধু নিজের মুক্তি চাইলে হয়তো বেঁচে যাওয়া যাবে। কিন্তু শিউলি, রনি, আর যাদের নামও আমি জানি না, তাদের ফেলে রেখে চলে গেলে সেই বেঁচে থাকা কি সত্যিই বাঁচা হবে?

রাত প্রায় বারোটার দিকে আচমকা পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল।

এক মুহূর্তে চারপাশ অন্ধকার।

নিচতলা থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল,

“জেনারেটর চালাও!”

করিডোরজুড়ে ছুটোছুটির শব্দ শুরু হলো। টর্চের আলো দেয়ালে দেয়ালে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই আমার দরজার তালায় খুব আস্তে একটা শব্দ হলো।

খচ…

তারপর আরেকটা।

দরজাটা পুরো খুলল না।

শুধু এক আঙুল ঢোকার মতো ফাঁক হলো।

ফাঁক দিয়ে খুব আস্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

“রূপা…”

আমি নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলাম।

কণ্ঠটা শিউলির।

“তাড়াতাড়ি বের হও। সময় খুব কম।”

আমি দরজার ফাঁক ঠেলে বাইরে বেরোলাম।

পুরো করিডোর অন্ধকার। দূরে কয়েকটা টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘুরছে। শিউলি আমার হাত শক্ত করে ধরল।

“উত্তরের সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে।”

আমি হাঁটতে শুরু করেও থেমে গেলাম।

“রনি?”

শিউলি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

“ও আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ছিল।

আমরা নিঃশব্দে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।

ঠিক তখনই নিচতলা থেকে গর্জে ওঠা একটি কণ্ঠ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে দিল।

“ওপরের দরজাটা কে খুলেছে?”

শিউলি আমার হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

ফিসফিস করে বলল,

“দৌড়াবে না। দৌড়ালে শেষ। আমার সঙ্গে যেমন বলি, ঠিক তেমনই হাঁটো।”

আমরা নিঃশব্দে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখলাম।

অন্ধকারের ভেতর আমাদের পালানোর পথ শুরু হয়ে গেছে।

১৯

সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন শব্দ করে উঠছিল। আমি যতই আস্তে পা ফেলি, মনে হচ্ছিল পুরো বাড়ি আমাদের শুনতে পাচ্ছে। নিচতলা থেকে লোকজনের চিৎকার ভেসে আসছে। কেউ জেনারেটর খুঁজছে, কেউ টর্চ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলাই আমাদের একমাত্র সুযোগ।

শিউলি আমার হাত ছাড়ল না।

ফিসফিস করে বলল, “আর কয়েক কদম। তারপর বাঁ দিকে।”

আমরা করিডোর পেরিয়ে বাড়ির পেছনের সরু দরজার সামনে এসে থামলাম। দরজাটা আধখোলা। বাইরে ভেজা মাটির গন্ধ। অনেক দিন পরে খোলা বাতাস বুক ভরে টানলাম। মনে হলো, পৃথিবীতে এখনো মুক্ত বাতাস আছে।

ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে ছোট্ট একটা ছায়া বেরিয়ে এল।

রনি।

সে হাঁপাচ্ছে।

“আপারা, তাড়াতাড়ি।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই এখানে কীভাবে এলি?”

সে উত্তর দিল না। শুধু আমাদের সামনে হাঁটতে শুরু করল। এত ছোট একটা ছেলে, অথচ এই বাড়ির প্রতিটি গলি, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ফটক তার মুখস্থ।

আমরা তিনজন ঝুঁকে ঝুঁকে এগিয়ে গেলাম।

বাড়ির উত্তর পাশে পুরোনো গুদামঘরটা বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হয়। টিনের চাল মরিচা ধরা। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছেই বুঝলাম, এই জায়গা এখনো ব্যবহার হয়। মাটিতে টায়ারের দাগ। পাশে সিগারেটের ফিল্টার। কোণে কয়েকটা খালি পানির বোতল।

রনি খুব আস্তে দরজাটা ঠেলে দিল।

দরজা কঁকিয়ে খুলে গেল।

ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

শিউলি ফিসফিস করে বলল, “এখানেই মেয়েদের রাখা হয়।”

আমি চারদিকে তাকালাম।

মেঝেতে ছেঁড়া চাদর।

এক কোণে ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার।

দেয়ালে দড়ি বাঁধার লোহার রিং।

আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

এই জায়গাটা শুধু অপেক্ষার ঘর নয়। এখানে মানুষকে শেষবারের মতো আটকে রাখা হয়, তারপর গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে খুব নিচু গলায় কেউ বলল,

“রূপা?”

আমি চমকে উঠলাম।

“কে?”

একজন মানুষ ধীরে ধীরে ছায়া থেকে বেরিয়ে এল।

তিনি সেই ডাক্তার।

আজ তাঁর গায়ে সাদা অ্যাপ্রন নেই। সাধারণ শার্ট-প্যান্ট পরা। মুখে ক্লান্তি, চোখে টানা কয়েক রাত না ঘুমানোর ছাপ।

তিনি দ্রুত বললেন, “সময় খুব কম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা পিকআপ ভ্যান আসবে। তোমাদের ওটার পেছনে উঠতে হবে।”

আমি সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি যেন আমার মনের কথাই বুঝলেন।

“তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ যদি দেরি করো, আর সুযোগ পাবে না।”

আমি বললাম, “আপনি আমাদের সাহায্য করছেন কেন?”

তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর খুব ধীরে বললেন,

“কারণ আমি অনেক বছর ধরে চুপ ছিলাম। আর কত জীবন নষ্ট হতে দেখব?”

শিউলি বলল, “বাইরে কি নিরাপদ?”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“পুরোপুরি না। এই চক্রটা বড়। কিন্তু বাইরে এমন মানুষ আছে, যারা এদের মতো নয়। তোমাদের আগে এখান থেকে বের হতে হবে।”

হঠাৎ বাইরে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল।

ডাক্তার জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।

তার মুখের রঙ বদলে গেল।

“না…”

আমি আতঙ্কিত হয়ে বললাম, “কী হয়েছে?”

তিনি খুব আস্তে বললেন,

“ওটা আমাদের গাড়ি না।”

পরের মুহূর্তেই গুদামঘরের বড় লোহার দরজার বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন গর্জে উঠল,

“সবাই ভেতরে আছে। দরজা বন্ধ করো।”

আমরা তিনজন একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকালাম।

২০

সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন শব্দ করে উঠছিল। আমি যতই আস্তে পা ফেলি, মনে হচ্ছিল পুরো বাড়ি আমাদের শুনতে পাচ্ছে। নিচতলা থেকে লোকজনের চিৎকার ভেসে আসছে। কেউ জেনারেটর খুঁজছে, কেউ টর্চ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলাই আমাদের একমাত্র সুযোগ।

শিউলি আমার হাত ছাড়ল না।

ফিসফিস করে বলল, “আর কয়েক কদম। তারপর বাঁ দিকে।”

আমরা করিডোর পেরিয়ে বাড়ির পেছনের সরু দরজার সামনে এসে থামলাম। দরজাটা আধখোলা। বাইরে ভেজা মাটির গন্ধ। অনেক দিন পরে খোলা বাতাস বুক ভরে টানলাম। মনে হলো, পৃথিবীতে এখনো মুক্ত বাতাস আছে।

ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে ছোট্ট একটা ছায়া বেরিয়ে এল।

রনি।

সে হাঁপাচ্ছে।

“আপারা, তাড়াতাড়ি।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই এখানে কীভাবে এলি?”

সে উত্তর দিল না। শুধু আমাদের সামনে হাঁটতে শুরু করল। এত ছোট একটা ছেলে, অথচ এই বাড়ির প্রতিটি গলি, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ফটক তার মুখস্থ।

আমরা তিনজন ঝুঁকে ঝুঁকে এগিয়ে গেলাম।

বাড়ির উত্তর পাশে পুরোনো গুদামঘরটা বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হয়। টিনের চাল মরিচা ধরা। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছেই বুঝলাম, এই জায়গা এখনো ব্যবহার হয়। মাটিতে টায়ারের দাগ। পাশে সিগারেটের ফিল্টার। কোণে কয়েকটা খালি পানির বোতল।

রনি খুব আস্তে দরজাটা ঠেলে দিল।

দরজা কঁকিয়ে খুলে গেল।

ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

শিউলি ফিসফিস করে বলল, “এখানেই মেয়েদের রাখা হয়।”

আমি চারদিকে তাকালাম।

মেঝেতে ছেঁড়া চাদর।

এক কোণে ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার।

দেয়ালে দড়ি বাঁধার লোহার রিং।

আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

এই জায়গাটা শুধু অপেক্ষার ঘর নয়। এখানে মানুষকে শেষবারের মতো আটকে রাখা হয়, তারপর গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে খুব নিচু গলায় কেউ বলল,

“রূপা?”

আমি চমকে উঠলাম।

“কে?”

একজন মানুষ ধীরে ধীরে ছায়া থেকে বেরিয়ে এল।

তিনি সেই ডাক্তার।

আজ তাঁর গায়ে সাদা অ্যাপ্রন নেই। সাধারণ শার্ট-প্যান্ট পরা। মুখে ক্লান্তি, চোখে টানা কয়েক রাত না ঘুমানোর ছাপ।

তিনি দ্রুত বললেন, “সময় খুব কম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা পিকআপ ভ্যান আসবে। তোমাদের ওটার পেছনে উঠতে হবে।”

আমি সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি যেন আমার মনের কথাই বুঝলেন।

“তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ যদি দেরি করো, আর সুযোগ পাবে না।”

আমি বললাম, “আপনি আমাদের সাহায্য করছেন কেন?”

তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর খুব ধীরে বললেন,

“কারণ আমি অনেক বছর ধরে চুপ ছিলাম। আর কত জীবন নষ্ট হতে দেখব?”

শিউলি বলল, “বাইরে কি নিরাপদ?”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“পুরোপুরি না। এই চক্রটা বড়। কিন্তু বাইরে এমন মানুষ আছে, যারা এদের মতো নয়। তোমাদের আগে এখান থেকে বের হতে হবে।”

হঠাৎ বাইরে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল।

ডাক্তার জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।

তার মুখের রঙ বদলে গেল।

“না…”

আমি আতঙ্কিত হয়ে বললাম, “কী হয়েছে?”

তিনি খুব আস্তে বললেন,

“ওটা আমাদের গাড়ি না।”

পরের মুহূর্তেই গুদামঘরের বড় লোহার দরজার বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন গর্জে উঠল,

“সবাই ভেতরে আছে। দরজা বন্ধ করো।”

আমরা তিনজন একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকালাম।

২১

গুদামঘরের ভেতর নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। বাইরে ভারী বুটের আওয়াজ আরও কাছে চলে এসেছে। ডাক্তার হাত তুলে আমাদের চুপ থাকার ইশারা করলেন। তাঁর মুখের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে।

লোহার দরজার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে বলল, “তালা লাগানো ছিল না কেন?”

আরেকজন উত্তর দিল, “এইমাত্র দেখে গেছি। কেউ না কেউ এখানে এসেছে।”

আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোও শুনতে পাবে।

রনি আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। এত ছোট্ট একটা ছেলে, অথচ তার হাত কাঁপছে না। সে খুব আস্তে গুদামের এক কোণের দিকে আঙুল দেখাল।

সেখানে পুরোনো বস্তা আর কাঠের বাক্সের স্তূপ।

ডাক্তার ফিসফিস করে বললেন, “ওদিকে।”

আমরা চারজন হামাগুড়ি দিয়ে বাক্সগুলোর আড়ালে চলে গেলাম।

ঠিক তখনই গুদামের দরজা কঁকিয়ে খুলে গেল।

টর্চের সাদা আলো এক ঝলকে পুরো ঘর ঘুরে গেল।

একজন বলল, “কেউ থাকলে বের হয়ে আয়। ধরা পড়লে অবস্থা খারাপ হবে।”

কেউ উত্তর দিল না।

আরেকজন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে টর্চ, কোমরে পিস্তল। আলো মেঝে থেকে শুরু করে একেকটা কোণে থামছে।

আলোটা ধীরে ধীরে আমাদের দিকেও এগিয়ে আসছিল।

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।

এত দূর এসে কি সব শেষ?

ঠিক সেই মুহূর্তে গুদামের বাইরে হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। যেন লোহার ড্রাম উল্টে পড়ে গেছে।

দুজন লোকই চমকে বাইরে তাকাল।

“ওদিকে কী হলো?”

“চল।”

তারা দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

ডাক্তার ফিসফিস করে বললেন, “এখনই।”

আমরা আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে এসে দেখি গুদামের পেছনের অন্ধকারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে হাত তুলে ইশারা করল।

“এইদিকে।”

ডাক্তার এক মুহূর্ত থেমে গেলেন।

আমি বুঝলাম, তিনিও লোকটিকে চিনতে পারছেন না।

লোকটা আবার বলল, “সময় নেই। ওরা ফিরে আসবে।”

শিউলি খুব নিচু গলায় বলল, “আমরা কি ওর সঙ্গে যাব?”

ডাক্তার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের হাতে ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল সরদার মার কণ্ঠ।

“গেট বন্ধ করো। কেউ যেন বাইরে যেতে না পারে।”

আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম।

অচেনা লোকটির দিকে যাব, নাকি অন্ধকারে অন্য কোনো পথ খুঁজব?

২২

অচেনা লোকটা একবারও পেছনে তাকাল না। সে শুধু হাত তুলে আমাদের অনুসরণ করতে বলল। দূরে সরদার মার লোকদের চিৎকার ক্রমশ কাছে চলে আসছে। গেটের লোহার পাল্লা বন্ধ হওয়ার বিকট শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।

ডাক্তার নিচু গলায় বললেন, “দাঁড়াও।”

লোকটা থেমে গেল।

“আপনি কে?”

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “এখন পরিচয় দেওয়ার সময় নেই। পাঁচ মিনিট পরে দিলে হয়তো আর কাউকে দেওয়ার সুযোগ পাব না।”

আমি শিউলির হাত শক্ত করে ধরলাম। রনি আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর নিঃশ্বাস দ্রুত চলছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করছে না।

লোকটা আবার বলল, “উত্তরের বাঁশঝাড়ের ভেতর একটা সরু পথ আছে। ওরা সেটা জানে না। যদি বাঁচতে চাও, আমার সঙ্গে চলো।”

ডাক্তার এবার এগিয়ে গেলেন।

“আপনি কীভাবে জানেন?”

লোকটা খুব ধীরে উত্তর দিল, “কারণ এই পথটা আমি নিজেই বানিয়েছিলাম।”

আমরা কেউই কিছু বুঝতে পারলাম না।

দূরে টর্চের আলো একের পর এক জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। অন্ধকার মাঠের ওপর সেগুলো এদিক-ওদিক ঘুরছে।

“ওদিকে দেখো!”

কারও গলা ভেসে এল।

“গুদামের পেছনটা খুঁজো!”

লোকটা আর সময় নষ্ট করল না। সে বাঁশঝাড়ের দিকে দৌড় দিল। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করার পর ডাক্তার বললেন, “চলো।”

আমরা তার পেছন পেছন ছুটলাম।

বাঁশঝাড়ের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশ আরও অন্ধকার হয়ে গেল। মাটিতে শুকনো পাতা। একটু অসাবধান হলেই শব্দ হবে। লোকটা এমনভাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছিল, যেন প্রতিটি গাছ, প্রতিটি বাঁক তার মুখস্থ।

হঠাৎ রনি ফিসফিস করে বলল, “আপা… ওরা আসতেছে।”

আমি পেছনে তাকালাম।

টর্চের আলো এখন বাঁশঝাড়ের মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

একজন চিৎকার করে উঠল, “এদিকে পায়ের দাগ আছে!”

আমরা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।

কিছুদূর গিয়ে লোকটা একটি শুকনো নালার পাশে থামল। নিচে নেমে হাত দিয়ে ঝোপ সরাতেই সরু একটা পথ দেখা গেল।

“একজন করে নামো।”

শিউলি প্রথমে নামল। তারপর রনি। আমি নামতে যাব, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গুলির শব্দ রাত কাঁপিয়ে দিল।

ধাম!

গুলিটা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বাঁশে লেগে ফিরে গেল। শুকনো বাঁশ কেঁপে উঠল।

রনি ভয়ে চিৎকার করে ফেলতে যাচ্ছিল। শিউলি সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরল।

লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “দৌড়াবে না। নিচু হয়ে এগোও।”

আমরা নালার ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে শুরু করলাম।

কয়েক মিনিট পর টর্চের আলো আর দেখা গেল না। শুধু দূরের চিৎকার ভেসে আসছে।

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, “আমরা… বেঁচে গেছি?”

লোকটা প্রথমবার আমার দিকে তাকাল।

তার চোখে গভীর ক্লান্তি।

সে খুব আস্তে বলল, “না।”

“তোমরা শুধু ওদের বাড়ি থেকে বের হয়েছ।”

“এখনও পুরো চক্রের ভেতরেই আছ।”

আমি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সে নিজের পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করে আমার হাতে দিল।

অন্ধকারেও পরিচয়পত্রের ওপর একটি শব্দ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

পুলিশ।

২৩

আমি পরিচয়পত্রটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

পুলিশ।

শব্দটা দেখে আমার ভেতরে এক মুহূর্তের জন্য আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে পড়ল ডাক্তারের সেই কথাগুলো।

“সবাই জড়িত না। একজন সৎ মানুষ খুঁজে বের করতে হবে।”

লোকটা পরিচয়পত্র আবার পকেটে রেখে বলল, “আমার নাম আরিফ। আগে এই এলাকার থানায় ছিলাম। এখন অন্য জেলায় বদলি হয়েছি।”

ডাক্তার ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি এত দিন কিছু করেননি কেন?”

আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর নিচু গলায় বললেন, “করেছিলাম।”

আমরা সবাই তার দিকে তাকালাম।

“প্রথমবার যখন অভিযোগ পাই, অভিযান চালাতে চেয়েছিলাম। অভিযানের আগের রাতেই খবর ফাঁস হয়ে যায়। বাড়িটা খালি। মেয়েদের অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেলা হয়।”

আমি বিস্ময়ে বললাম, “খবর কে দিয়েছিল?”

আরিফ তিক্ত হেসে বললেন, “যাদের দেওয়া উচিত ছিল না, তাদের কেউ একজন।”

চারপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।

দূরে কুকুর ডাকছে। রাত আরও গভীর হয়েছে।

আরিফ আবার বললেন, “এরা শুধু একটা বাড়ি চালায় না। এদের লোক আছে বিভিন্ন জায়গায়। দালাল আছে গ্রামে। গাড়িচালক আছে। ভুয়া চাকরির এজেন্ট আছে। কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত লোকও আছে, যারা টাকার বিনিময়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। তাই একটা বাড়ি থেকে বের হলেই সব শেষ হয়ে যায় না।”

আমি ধীরে ধীরে বললাম, “তাহলে আমরা এখন কোথায় যাব?”

“আগে নিরাপদ জায়গায়। তারপর তোমাদের জবানবন্দি লাগবে। কিন্তু তার আগে তোমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”

রনি এতক্ষণ চুপ করে ছিল।

সে হঠাৎ বলল, “নীলা আপারে ফিরাইয়া আনা যাবে?”

প্রশ্নটা শুনে কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না।

আরিফ হাঁটু গেড়ে রনির চোখের সমান হয়ে বসে বললেন, “আমি মিথ্যা কথা বলব না। খুব কঠিন হবে। কিন্তু চেষ্টা করা হবে।”

রনি মাথা নিচু করে ফেলল।

শিউলি ফিসফিস করে বলল, “সাবিহা?”

ডাক্তার চোখ বন্ধ করলেন।

“যত দেরি হবে, তত কঠিন হবে।”

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

আমি বুঝলাম, আমাদের পালানোই শেষ লক্ষ্য নয়।

যারা ইতিমধ্যে এই চক্রের হাতে পড়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেই এখনো বন্দি।

তাদের জন্যও কিছু করতে হবে।

ঠিক তখনই আরিফের ফোন নিঃশব্দে কেঁপে উঠল।

তিনি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেলেন।

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”

আরিফ খুব ধীরে বললেন, “খারাপ খবর।”

“ওরা বুঝে গেছে তোমরা পালিয়েছ।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল।

“তারপর?”

তিনি ফোনটা বন্ধ করে পকেটে রাখলেন।

“এখন থেকে শুধু তোমাদের না, তোমাদের গ্রামের মানুষও ঝুঁকিতে থাকতে পারে। কারণ এই চক্র একটা নিয়ম মেনে চলে।”

“যে পালায়, তাকে খোঁজে।”

“আর যাকে খুঁজে পায় না…”

২৪

রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। পূর্ব আকাশে হালকা ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমরা চারজন আরিফের পেছন পেছন সরু মাটির পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। চারদিকে ধানের ক্ষেত। ভোরের শিশিরে ভিজে থাকা ঘাসে পা পড়লেই জুতো ভিজে যাচ্ছে। এত খোলা আকাশ আমি কত দিন পরে দেখছি, তা আর মনে করতে পারছিলাম না। অথচ মুক্ত আকাশের নিচেও আমার বুকের ভেতর বন্দি হওয়ার ভয়টা একটুও কমেনি।

আরিফ হঠাৎ হাত তুলে থামার ইশারা করলেন।

সবাই নিচু হয়ে বসে পড়লাম।

দূরের কাঁচা রাস্তায় একটি কালো মাইক্রোবাস ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। গাড়িটির কাচ কালো ফিল্মে ঢাকা। ভেতরে কে আছে বোঝার উপায় নেই।

গাড়িটা চলে যাওয়ার পরও আরিফ আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন।

তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “ওরা সাধারণত একবার খোঁজ নিয়ে চলে যায় না। একই রাস্তা দুইবারও আসে।”

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিশ্চিত ওরা আমাদেরই খুঁজছে?”

আরিফ উত্তর দিলেন, “নিশ্চিত হওয়ার দরকার নেই। সন্দেহ করাই এখন নিরাপদ।”

আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম।

রনি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার ছোট ছোট পা আর এগোতে চাইছে না। আমি তাকে কোলে নিতে চাইলে সে মাথা নাড়ল।

“আমি হাঁটতে পারব।”

তার গলায় এমন এক জেদ, যা কোনো শিশুর থাকার কথা নয়।

অনেকটা পথ পেরিয়ে আমরা একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার কাছে পৌঁছালাম। ভাঙা চিমনি, আগাছায় ঢেকে যাওয়া উঠান আর অর্ধেক ভেঙে পড়া একটি ছোট অফিসঘর। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় বহু বছর ধরে এখানে কেউ আসে না।

আরিফ দরজায় তিনবার টোকা দিলেন।

একবার।

তারপর দুইবার।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ভেতর থেকে খুব আস্তে দরজা খুলল।

পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের একজন মহিলা আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখে ঘুম নেই, বরং দীর্ঘদিনের সতর্কতা।

তিনি শুধু বললেন, “ভেতরে আসুন।”

ঘরটায় ঢুকেই আমি বুঝলাম, এটা সাধারণ কোনো জায়গা নয়। কোণের আলমারিতে শুকনো খাবার, কয়েকটি কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স আর দেয়ালে টাঙানো বাংলাদেশের মানচিত্র।

মহিলা আমাদের পানি দিলেন।

রনি গ্লাসটা দুই হাতে ধরে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল।

মহিলা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “ভয় পেয়ো না।”

রনি কিছু বলল না।

সে শুধু আমার পাশেই এসে বসল।

আরিফ মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সময় খুব কম। ওরা পালিয়েছে জেনে গেছে।”

মহিলার মুখের ভাব বদলে গেল।

“কতজন জানে?”

“এখনো নিশ্চিত নই। তবে খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগবে না।”

ডাক্তার প্রথমবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

“অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য নিরাপদ তো?”

মহিলা সরাসরি উত্তর দিলেন না।

বরং জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালেন।

তারপর ধীরে বললেন, “এই কাজে একটা কথা কখনো ধরে নেওয়া যায় না। নিরাপদ জায়গা বলে কিছু নেই। আছে শুধু অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গা।”

আমি এতক্ষণ চুপ ছিলাম।

হঠাৎ বললাম, “আমরা কি পুলিশকে সব বলতে পারব?”

আরিফ আমার দিকে তাকালেন।

“পারবে। কিন্তু তার আগে আমাদের প্রমাণ লাগবে। শুধু তোমাদের কথা দিয়ে পুরো চক্র ভাঙা কঠিন।”

আমি হতাশ হয়ে মাথা নিচু করলাম।

ঠিক তখনই ডাক্তার বললেন, “প্রমাণ আছে।”

সবাই একসঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল।

তিনি ধীরে ধীরে শার্টের ভেতরের পকেট থেকে একটি ছোট মেমোরি কার্ড বের করলেন।

“গত আট মাস ধরে আমি সুযোগ পেলেই তথ্য জমিয়েছি। গাড়ির নম্বর, কয়েকজন দালালের ছবি, লেনদেনের নথি, এমনকি কয়েকটি গোপন ভিডিওও আছে।”

আমার বুকের ভেতর আবার আশার আলো জ্বলে উঠল।

কিন্তু সেই আলো স্থায়ী হলো না।

বাইরে হঠাৎ একটি গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ শোনা গেল।

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই সবাই স্থির হয়ে গেল।

মহিলা ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন।

তার মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন,

“ওরা এত তাড়াতাড়ি এখানে পৌঁছে গেল কীভাবে?”

২৫

ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এল যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

আরিফ দ্রুত জানালার পাশে গিয়ে নিচু হয়ে বাইরে তাকালেন। উঠোনে একটি সাদা পিকআপ দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে তিনজন লোক নামছে। তাদের কারও হাতে অস্ত্র দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাদের চলাফেরা দেখে বোঝা যায়, তারা জানে কী খুঁজতে এসেছে।

মহিলা ফিসফিস করে বললেন, “ওরা যদি এখানে এসে থাকে, তাহলে ঠিকানা জেনেই এসেছে।”

ডাক্তার মেমোরি কার্ডটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এটা তুমি রাখো।”

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।

“আমি কেন?”

“কারণ যদি আমাকে ধরে ফেলে, প্রথমে আমার শরীর তল্লাশি করবে। তোমাকে এখনো কেউ সন্দেহ করছে না।”

আমি মেমোরি কার্ডটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে চেপে ধরলাম।

বাইরে দরজায় ধাক্কার শব্দ হলো।

ঠক।

তারপর আরও জোরে।

ঠক ঠক ঠক।

একটা কর্কশ গলা ভেসে এল।

“দরজা খুলুন। আমরা পুলিশ।”

ঘরের ভেতর কেউ নড়ল না।

আরিফ খুব শান্ত গলায় বললেন, “আসল পুলিশ কখনো এভাবে পরিচয় দিয়ে দরজা ভাঙতে আসে না।”

আরেকটি ধাক্কা।

এবার আগের চেয়ে অনেক জোরে।

দেয়ালের ধুলো ঝরে পড়ল।

মহিলা দ্রুত ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো কাঠের আলমারিটা সরিয়ে দিলেন। তার পেছনে সরু একটি গোপন দরজা দেখা গেল।

“এই পথ ধরে গেলে পুরোনো ড্রেনের সঙ্গে মিলবে। ড্রেন পেরোলেই নদীর পাড়।”

শিউলি বিস্ময়ে বলল, “আপনি আগে বলেননি কেন?”

মহিলা মৃদু হেসে বললেন, “সব পথ সবার জন্য খোলা থাকে না।”

আরিফ সিদ্ধান্ত নিলেন মুহূর্তেই।

“রূপা, রনি আর শিউলি আগে নামবে। ডাক্তার, আপনি ওদের সঙ্গে থাকবেন। আমি আর আপা কিছুক্ষণ ওদের আটকে রাখার চেষ্টা করি।”

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না। আমরা কাউকে রেখে যাব না।”

আরিফ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কখনো কখনো কাউকে বাঁচাতে হলে কাউকে ঝুঁকি নিতেই হয়।”

দরজায় এবার লাথির শব্দ শুরু হলো।

কাঠ কেঁপে উঠছে।

রনি কাঁপা গলায় বলল, “আপা… ওরা ঢুকে পড়বে?”

আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

ডাক্তার নিচু হয়ে বললেন, “সময় শেষ।”

আমরা একে একে গোপন পথ দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মাথার ওপর দিয়ে মানুষের দৌড়ানোর শব্দ, চিৎকার আর দরজা ভাঙার বিকট আওয়াজ ভেসে আসছে।

হঠাৎ ওপরে একটি নারীকণ্ঠ চিৎকার করে উঠল।

তারপর সঙ্গে সঙ্গে গুলির শব্দ।

ধাম!

রনি থমকে দাঁড়াল।

“ওইটা…?”

ডাক্তার ওর কাঁধ ধরে বললেন, “পেছনে তাকাবে না।”

আমরা অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে সামনে এগোতে লাগলাম।

কয়েক মিনিট পরে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

আমি ভেবেছিলাম বাইরে বের হলেই হয়তো মুক্ত বাতাস পাব।

কিন্তু মুখ বের করতেই দেখি নদীর পাড়ে আগে থেকেই দুটি নৌকা দাঁড়িয়ে আছে।

আর নৌকার পাশে কয়েকজন লোক আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।

তাদের একজন ধীরে ধীরে হাততালি দিতে দিতে এগিয়ে এল।

তার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি।

“অনেক কষ্ট করে এলে।”

“এবার কোথায় যাবে?”

২৬

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখ আমি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললাম।

সে সেই মানুষ, যাকে আমি প্রথম দিন ট্রানজিট হাউসের উঠোনে দেখেছিলাম। মেয়েদের নামের তালিকা হাতে নিয়ে একে একে ডাকছিল। তখন তার মুখে কোনো রাগ ছিল না, কোনো মায়াও ছিল না। যেন মানুষ নয়, পণ্য গুনছিল।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“পালাতে পারবে ভেবেছিলে?”

কেউ উত্তর দিল না।

আমাদের পেছনে অন্ধকার সুড়ঙ্গ, সামনে নদী। ডানদিকে কাদায় ভরা চর, বাঁদিকে খাড়া পাড়। পালানোর মতো কোনো পথ চোখে পড়ছে না।

লোকটা চারপাশে তাকিয়ে বলল, “ডাক্তার কোথায়?”

ডাক্তার সামনে এগিয়ে এলেন।

“আমি এখানে।”

লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলে। এত দিন খাইয়েছি, রেখেছি, আর তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করলে।”

ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেন, “বিশ্বাসঘাতকতা আমি করিনি। করেছি তোমরা। যারা মানুষের জীবন বিক্রি করে, তারা নিজেরাই মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।”

লোকটার চোখ সরু হয়ে গেল।

সে হাত তুলে ইশারা করতেই দুজন লোক সামনে এগিয়ে এল।

ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল মেমোরি কার্ডটার কথা।

আমি অজান্তেই ওড়নার ভাঁজে হাত দিয়ে সেটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।

এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

লোকটা হঠাৎ আমার দিকে তাকাল।

“ওর শরীর তল্লাশি করো।”

আমার বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

দুজন লোক এগিয়ে আসছে।

আমি বুঝলাম, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা মেমোরি কার্ডটা খুঁজে পাবে।

ঠিক তখনই নদীর ওপার থেকে ভেসে এল একটি লম্বা হর্নের শব্দ।

সবাই একসঙ্গে তাকাল।

কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটি ট্রলার এগিয়ে আসছে।

লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, “এই সময়ে আবার কে?”

আরিফ খুব আস্তে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,

“সুযোগ পেলেই দৌড়াবে।”

“যেদিকেই যাও, মেমোরি কার্ডটা বাঁচিয়ে রাখবে।”

আমি কিছু বলার আগেই ট্রলারটি আরও কাছে চলে এল।

ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষের ছায়া দেখা যাচ্ছে।

তাদের একজন হাত তুলে চিৎকার করে উঠল,

“কেউ নড়বে না!”

নদীর দুই পাড়ই মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু কার নির্দেশে সবাই থেমে গেল, তা তখনও আমরা বুঝতে পারিনি।

২৭

ট্রলারটি ঘাটে ভিড়তেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের একজন লাফিয়ে নিচে নেমে এল। তার গায়ে সাধারণ পোশাক। দূর থেকে দেখে তাকে আলাদা করার কোনো উপায় নেই।

সে চারপাশে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কেউ অস্ত্র তুলবেন না।”

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।

“তুমি কে?”

লোকটি নিজের পকেট থেকে একটি পরিচয়পত্র বের করল। কিন্তু দূরত্বের কারণে আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না।

সে শুধু বলল, “আজ কাউকে নিয়ে যেতে আসিনি। আমি এসেছি একজনকে ফিরিয়ে নিতে।”

পাচারচক্রের লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাল।

তাদের মুখে প্রথমবারের মতো দ্বিধা দেখা গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে আরিফ খুব আস্তে বললেন, “রূপা, এখন।”

আমি বুঝতে পারলাম তিনি কী বলতে চাইছেন।

আমার হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট মেমোরি কার্ডটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করলাম।

সবার দৃষ্টি তখন ট্রলারের দিকে।

আরিফ ইচ্ছে করেই সামনে এগিয়ে গেলেন।

“তোমরা আমাকে খুঁজছ না? আমি এখানে।”

লোকটা রাগে গর্জে উঠল।

“ধর ওকে!”

দুজন লোক আরিফের দিকে ছুটে গেল।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ইশারা করলেন।

আমি রনির হাত ধরলাম।

শিউলিও আমাদের সঙ্গে দৌড় দিল।

নদীর পাড়ের কাদামাটি পেরিয়ে আমরা ঝোপের ভেতর ঢুকে গেলাম।

পেছন থেকে চিৎকার ভেসে আসছে।

“মেয়েটাকে ধর!”

“ওর কাছেই আছে!”

আমার বুক ধড়ফড় করছে।

তারা জানে।

তারা জানে প্রমাণটা আমার কাছেই।

হঠাৎ সামনে গিয়ে পথ শেষ হয়ে গেল।

একটি ভাঙা বাঁশের সাঁকো।

নিচে বর্ষার স্রোতে ফুলে ওঠা খাল।

রনি আতঙ্কিত গলায় বলল, “আপা… এখন?”

আমি সাঁকোটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তিনজন একসঙ্গে উঠলে এটা ভেঙে পড়বে।

পেছনের চিৎকার আরও কাছে চলে এসেছে।

শিউলি বলল, “আমি আগে যাই।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না। রনি আগে যাবে।”

রনি ভয় পাচ্ছিল।

আমি হাঁটু গেড়ে বসে তার কাঁধে হাত রাখলাম।

“শোন, তুই পারবি। ওপারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি। আমি আসছি।”

রনি কাঁপতে কাঁপতে সাঁকোয় পা রাখল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে গুলির শব্দ শোনা গেল।

সাঁকোর বাঁশ কেঁপে উঠল।

রনি ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

শিউলি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরে ফেলল।

আমি ঘুরে তাকালাম।

দূরে পাচারচক্রের সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে।

তার হাতে অস্ত্র।

সে আর আমার দিকে তাকিয়ে নেই।

তার চোখ স্থির হয়ে আছে আমার মুঠোর দিকে।

সে ধীরে ধীরে বলল,

“মেয়েটাকে মারবে না।”

“ওর হাতে যা আছে, সেটা অক্ষত অবস্থায় চাই।”

২৮

ট্রলারের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো দ্রুত নদীর পাড়ে নেমে এল। তাদের হাতে টর্চ, কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু তারা কোনো গুলি চালাল না। যেন সবাই অপেক্ষা করছে, কে আগে ভুল করবে।

পাচারচক্রের নেতা ঠান্ডা চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই জায়গাটা আমাদের। এখানে ঢোকার আগে অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল।”

সামনের লোকটি ধীরে ধীরে উত্তর দিল, “মানুষ বিক্রির জায়গা কখনো কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না।”

দুজনের চোখাচোখি হলো। বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।

এই সুযোগে আরিফ আমার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন, “রূপা, ডান দিকে ঝোপের ভেতর দিয়ে চলে যাও। কেউ যদি তোমাকে থামায়, মেমোরি কার্ডটা ভেঙে ফেলবে, কিন্তু ওদের হাতে দেবে না।”

আমি মাথা নেড়ে রনির হাত ধরলাম। শিউলি আমাদের সঙ্গে এগিয়ে এল। আমরা ধীরে ধীরে ঝোপের আড়াল ধরে সরে যেতে শুরু করলাম। সামনে কয়েক গজ দূরেই একটি সরু বাঁশবাগান। ওখানে পৌঁছাতে পারলেই হয়তো কিছুটা আড়াল পাওয়া যাবে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি গলা ভেসে এল।

“ওই মেয়েটাকে যেতে দিও না।”

আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। রনিকে নিয়ে দৌড় দিলাম। পেছনে মানুষের চিৎকার, দৌড়ানোর শব্দ, টর্চের আলো সব একসঙ্গে মিশে গেল। বাঁশবাগানের ভেতর ঢুকতেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। শুকনো পাতার ওপর পা পড়লেই মচমচ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছিল সেই শব্দই আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ সামনে একটি ভাঙা কুঁড়েঘর চোখে পড়ল। দরজা আধখোলা। আমরা ভেতরে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়লাম। রনি কাঁপছিল। শিউলির কপালে কাদা আর রক্ত লেগে আছে। কখন লেগেছে, কেউ খেয়ালই করিনি।

আমি ওড়নার ভাঁজ থেকে মেমোরি কার্ডটা বের করলাম। এত ছোট একটা জিনিস, অথচ কত মানুষের জীবন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

শিউলি ফিসফিস করে বলল, “এতে কী আছে?”

আমি মাথা নাড়লাম।

“জানি না।”

ঠিক তখনই কুঁড়েঘরের কোণ থেকে ক্ষীণ কাশির শব্দ শোনা গেল।

আমরা তিনজনই চমকে উঠলাম।

অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। তাঁর চুল সাদা, গায়ে ময়লা চাদর। দেখে মনে হয় বহুদিন ধরে এখানে থাকেন।

তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় পেয়ো না। আমি সব দেখেছি।”

আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কে?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অনেক বছর আগে আমার মেয়েকেও এই চক্র নিয়ে গিয়েছিল। তাকে আর কোনো দিন খুঁজে পাইনি। তারপর থেকে যারা পালিয়ে আসে, তাদের লুকিয়ে রাখি।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।

বৃদ্ধ আমার হাতের মেমোরি কার্ডটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,

“ওটা শুধু প্রমাণ নয়।”

“ওটার মধ্যে এমন একজন মানুষের নাম আছে, যার নাম প্রকাশ হলে পুরো দেশ কেঁপে উঠবে।”

আমার হাত হঠাৎ কেঁপে উঠল।

২৯

ঘরের ভেতরে কেউ কোনো কথা বলছিল না। বাইরে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো মেঝের ওপর এসে পড়েছে। অথচ সেই আলোও যেন আমাদের ভেতরের অন্ধকার দূর করতে পারছিল না।

বৃদ্ধ লোকটি ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে বহু বছরের ক্লান্তি। তিনি আমার হাতে ধরা মেমোরি কার্ডটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনেক মানুষ এই জিনিসটার জন্য জীবন দিয়েছে।”

আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কীভাবে জানেন?”

তিনি উত্তর দিলেন, “কারণ এটা সংগ্রহ করার কাজ একা ডাক্তার করেনি। আমিও করেছি।”

ডাক্তার অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালেন।

“আপনি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন, “সবাই আমাকে মৃত ভেবেই নিরাপদ ছিল। আমি চাইনি কেউ জানুক আমি এখনো আছি।”

ঘরের ভেতরে আবার নীরবতা নেমে এল।

আরিফ দ্রুত দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফিরে এলেন।

“আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। ওরা আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।”

বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “তাহলে আর লুকিয়ে লাভ নেই। সত্যিটা জানার সময় এসেছে।”

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট কাগজ বের করলেন। কাগজে কয়েকটি নাম লেখা।

আমি কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম। বেশিরভাগ নামের পাশে লাল দাগ টানা। কিছু নামের পাশে লেখা, “নিখোঁজ”, কিছু নামের পাশে, “মারা গেছে”।

শেষ লাইনে একটি নাম লেখা ছিল। সেই নামের পাশে কোনো দাগ নেই।

আমি নামটি পড়ে থমকে গেলাম।

এটাই সেই মানুষ, যার কথা বৃদ্ধ বলছিলেন।

আমি ফিসফিস করে বললাম, “এ কি সম্ভব?”

ডাক্তার কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে পড়লেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁর মুখের রঙ বদলে গেল।

“না… এটা যদি সত্যি হয়…”

আরিফ কাগজটি দেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।

“তাহলে এত দিন আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছিলাম।”

শিউলি উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “কে এই মানুষটা?”

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “যে কখনো সামনে আসে না। যার নাম কেউ উচ্চারণ করতে চায় না। যার কারণে সাক্ষীরা হারিয়ে যায়, তদন্ত থেমে যায়, আর এই ব্যবসা বছরের পর বছর চলতে থাকে।”

হঠাৎ বাইরে শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো।

আরিফ সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র তুলে দরজার পাশে অবস্থান নিলেন।

কেউ একজন খুব আস্তে কুঁড়েঘরের দরজায় তিনবার টোকা দিল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

বৃদ্ধের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন,

“অসম্ভব…”

“এই সংকেতটা শুধু একজন মানুষই জানে।”

৩০

ঘরের ভেতরে এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন সময়ও থেমে গেছে। দরজায় আর কোনো শব্দ নেই। বাইরে ভোরের আলো একটু একটু করে বাড়ছে, কিন্তু সেই আলো আমাদের ভয়ের অন্ধকার ভেদ করতে পারছিল না।

আরিফ দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর হাত অস্ত্রের ওপর শক্ত হয়ে আছে। ডাক্তার নিঃশব্দে রনিকে নিজের পেছনে সরিয়ে নিলেন। শিউলি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি অনুভব করলাম, আমার মুঠোয় ধরা ছোট্ট মেমোরি কার্ডটা ঘামে ভিজে গেছে।

বৃদ্ধ খুব আস্তে বললেন, “কেউ কোনো কথা বলবে না।”

বাইরে থেকে আবার তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তারপর একটি শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“দরজা খুলুন। আমি একা এসেছি।”

কণ্ঠস্বরটায় কোনো হুমকি ছিল না। কিন্তু অদ্ভুত এক দৃঢ়তা ছিল।

আরিফ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?”

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে লোকটি উত্তর দিল, “আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। তাই নাম বলেও লাভ নেই।”

বৃদ্ধ হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।

তিনি ফিসফিস করে বললেন, “না… এই গলাটা…”

ডাক্তার বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকালেন।

“আপনি চিনেছেন?”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“বিশ বছর আগে যাকে মৃ//ত ভেবেছিলাম… এই গলাটা তার।”

ঘরের ভেতরে উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিফ ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে বললেন, “আপনার কাছে প্রমাণ আছে যে আপনি আমাদের শত্রু নন?”

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি বলল, “আমার বাম কাঁধে পুরোনো গুলির দাগ আছে। আর আপনার ডান হাতে যে কাটা দাগ, সেটা পাঁচ বছর আগে সীমান্তে হয়েছিল।”

আরিফের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

এই তথ্য খুব কম মানুষই জানত।

তিনি ধীরে ধীরে দরজার খিল খুললেন।

দরজা খুলতেই প্রায় ষাট বছরের এক মানুষ ভেতরে ঢুকলেন। মুখে ধূসর দাড়ি, গায়ে ধুলো মাখা পাঞ্জাবি। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার ক্লান্তি স্পষ্ট।

বৃদ্ধ তাঁকে দেখে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন।

দুজন মানুষ অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না।

তারপর বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন,

“তুমি বেঁচে আছ?”

লোকটি মৃদু হাসলেন।

“বেঁচে ছিলাম বলেই এত দিন ওদের ভেতরে থাকতে পেরেছি।”

আমরা কেউ কিছু বুঝতে পারছিলাম না।

লোকটি ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকালেন।

“মেমোরি কার্ডটা তোমার কাছে আছে?”

আমি কিছুক্ষণ দ্বিধা করে মাথা নাড়লাম।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ভালো হয়েছে। কারণ ওটা আসল প্রমাণ নয়।”

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

“তাহলে?”

লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করলেন।

চাবিটির সঙ্গে ছোট্ট একটি ধাতব ট্যাগ বাঁধা।

সেখানে লেখা,

লকার ৩১৭।

লোকটি বললেন, “মেমোরি কার্ডটা শুধু পথ দেখাবে। আসল নথি, হিসাব, ছবি আর ভিডিও রাখা আছে এই লকারে।”

ডাক্তার বিস্ময়ে বললেন, “কোথায়?”

লোকটি উত্তর দিলেন,

“ঢাকায়।”

তিনি বাকিটা বলার আগেই বাইরে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ির শব্দ ভেসে এল।

আরিফ জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে তাঁর মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“ওরা শুধু আমাদের খুঁজতে আসেনি।”

“ওরা পুরো জায়গাটা ঘিরে ফেলেছে।”

৩ম

আজই যুক্ত হও পাঙ্গাশ পুকুরে..

নিয়মিত নটিফিকেশন পেতে নতুন নতুন আর্টিকেলের আজ ই যুক্ত হও, মনারা। মিস যাবে না একটা আর্টিকেলও।

We don’t spam!