আল্লাহ তাআলা কুরআনে এমন একটি নাম উল্লেখ করেছেন, যেটি শুধু একটি জাতির উপাস্য ছিল না। হাজার বছরের ইতিহাস, অসংখ্য সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, ধর্মীয় গ্রন্থ এবং মধ্যযুগীয় কিংবদন্তির মধ্যে ঘুরেফিরে একই নাম বারবার ফিরে এসেছে। সেই নামটি হলো, “বাল”।

সূরা আস-সাফফাতে হযরত ইলিয়াস (আ.) তার জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

“তোমরা কি বালকে ডাকছ এবং সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ছেড়ে দিচ্ছ?”
(সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:১২৫)

এই একটি আয়াত থেকেই বোঝা যায়, বাল কোনো সাধারণ মূর্তি ছিল না। এমন এক মিথ্যা উপাস্য ছিল যার পূজা একটি পুরো সভ্যতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, বাল কে ছিল?

মজার বিষয় হলো, “বাল” শুরুতে কোনো ব্যক্তির নামই ছিল না।

প্রাচীন সেমিটিক ভাষায় Baʿal শব্দের অর্থ ছিল “প্রভু”, “মালিক” অথবা “অধিপতি”। উগারিত, ফিনিশীয়, কেনানীয় এবং আরও কয়েকটি সেমিটিক ভাষায় এটি একটি উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উপাধিই একটি নির্দিষ্ট মিথ্যা উপাস্যের পরিচয়ে পরিণত হয়।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না।

১৯২৮ সালে বর্তমান সিরিয়ার রাস শামরা অঞ্চলে ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ Claude F. A. Schaeffer-এর নেতৃত্বে খননকাজ শুরু হয়। সেখানে আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন উগারিত নগরীর ধ্বংসাবশেষ এবং হাজার হাজার কিউনিফর্ম মাটির ফলক।

এই ফলকগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায় বিখ্যাত Baal Cycle।

সেখানে বালকে ঝড়, বজ্র, বৃষ্টি এবং উর্বরতার মিথ্যা উপাস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। কৃষিনির্ভর সমাজে বৃষ্টি মানেই ছিল জীবন। তাই মানুষ বিশ্বাস করত, ফসল, বৃষ্টি এবং সমৃদ্ধি এই উপাস্যের হাতেই নির্ভর করে।

এই গ্রন্থে আরও দেখা যায়, বাল সমুদ্রের দেবতা Yam এবং মৃ//ত্যুর দেবতা Mot-এর সঙ্গে যু//দ্ধ করছে।

অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতিটি শক্তিকে তারা আলাদা আলাদা দেবতায় ভাগ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করত।

এখন প্রশ্ন হলো, এই উপাসনা কতটা বিস্তৃত ছিল?

মজার বিষয় হলো, বালের প্রভাব শুধু উগারিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত Amarna Letters, যা মিশরের ফেরাউনদের সঙ্গে কেনান অঞ্চলের শাসকদের কূটনৈতিক চিঠিপত্র, সেখানে Baal-hanan, Baal-melek এবং Baalis-এর মতো বহু নাম পাওয়া যায়।

অর্থাৎ বালের নাম শুধু মন্দিরেই ছিল না, রাজাদের নামেও ছিল।

এটা প্রমাণ করে, বাল ধর্মের পাশাপাশি রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থারও অংশ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না।

হিব্রু বাইবেলের ১ Kings অধ্যায় ১৮-এ হযরত ইলিয়াহ (আ.) এবং বালের ৪৫০ জন নবীর বিখ্যাত মুখোমুখি সংঘর্ষের বর্ণনা রয়েছে।

ইলিয়াহ ঘোষণা করেন, যদি বাল সত্যিই শক্তিশালী হয় তাহলে সে আগুনের মাধ্যমে উত্তর দিক।

বালের অনুসারীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রার্থনা করেও কোনো উত্তর পায় না।

এরপর আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আকাশ থেকে আগুন নেমে আসে।

বাইবেলের গবেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়। এটি প্রাচীন ইসরায়েলে একেশ্বরবাদ এবং কেনানীয় মূর্তিপূজার সংঘাতের প্রতীক।

কিন্তু বিষয়টি আরও ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে।

ফিনিশীয়দের মাধ্যমে বালের উপাসনা ছড়িয়ে পড়ে Tyre, Sidon এবং পরে উত্তর আফ্রিকার Carthage পর্যন্ত।

সেখানে Baal Hammon নামে একই মিথ্যা উপাস্যের পূজা করা হতো।

গ্রিক ইতিহাসবিদ Diodorus Siculus, Plutarch এবং Cleitarchus লিখেছেন, কার্থেজে বালের উদ্দেশ্যে শিশু ব//লি দেওয়া হতো।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই বিষয়ে একমত নন।

কার্থেজের বিখ্যাত Tophet কবরস্থান থেকে হাজার হাজার শিশুর দে//হাবশেষ পাওয়া গেলেও আজও বিতর্ক রয়েছে, এগুলো সত্যিই ব//লির শিকার শিশু ছিল, নাকি অল্প বয়সে মৃ//ত্যুবরণ করা শিশুদের কবরস্থান।

অর্থাৎ প্রাচীন লেখকরা একটি দাবি করেছেন, কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব এখনো তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না।

গ্রিক লেখক Philo of Byblos, যিনি আরও প্রাচীন লেখক Sanchuniathon-এর রচনা উদ্ধৃত করেন, সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাল শুরুতে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিল। পরে তাকে উপাস্য বানানো হয়।

তবে আধুনিক গবেষকদের অধিকাংশই এই দাবিকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করেন না।

এটিকে তারা পরবর্তী ফিনিশীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখেন।

মজার বিষয় হলো, রোমান যুগে এসে বালের পরিচয় আবার বদলে যায়।

সিরিয়ার Baalbek অঞ্চলে তার উপাসনা Jupiter Heliopolitanus-এর সঙ্গে মিশে যায়।

আবার কোথাও Jupiter Dolichenus-এর সঙ্গেও তার বৈশিষ্ট্য একীভূত হতে থাকে।

অর্থাৎ সভ্যতা বদলেছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, কিন্তু একই মিথ্যা উপাস্য শুধু নতুন নতুন পরিচয় পেয়েছে।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না।

মধ্যযুগে ইউরোপে রচিত Pseudomonarchia Daemonum, পরে The Lesser Key of Solomon-এর Ars Goetia অংশে Bael নামে এক ডেমোনিক এন্টিটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

সেখানে তাকে ৭২ জন Goetic Spirit-এর প্রথমজন বলা হয়েছে।

দাবি করা হয়, সে একজন রাজা, তার অধীনে ৬৬টি লিজিয়ন রয়েছে এবং সে মানুষকে অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা দিতে পারে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।

এগুলো বাইবেলের অংশ নয়।

ইসলামি উৎসও নয়।

এগুলো সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় গুপ্তবিদ্যার সাহিত্য।

তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো।

যে সত্তাকে হাজার বছর আগে কেনানীয়রা উপাসনা করত, পরবর্তী ইউরোপীয় ঐতিহ্যে সেই নামই একসময় ডেমোনিক এন্টিটির পরিচয়ে রূপ নেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন এই পুরো ইতিহাসের কোন অংশ নিয়ে কথা বলে?

আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুরআন বালের পৌরাণিক গল্প বলে না।

তার যু//দ্ধের গল্প বলে না।

তার কথিত অলৌকিক ক্ষমতার কথাও বলে না।

কুরআন শুধু একটি প্রশ্ন করে,

“তোমরা কি বালকে ডাকছ এবং সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ছেড়ে দিচ্ছ?”

এখানেই কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য সব উৎস থেকে আলাদা।

উগারিতের ফলক আমাদের বলে, মানুষ বালকে কীভাবে কল্পনা করত।

মিশরের আমার্না চিঠি বলে, কীভাবে তার নাম রাজাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল।

বাইবেল বলে, নবীরা কীভাবে এই মিথ্যা উপাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন।

গ্রিক ও রোমান ইতিহাস দেখায়, কীভাবে এক সভ্যতার উপাস্য আরেক সভ্যতায় নতুন পরিচয় পেয়েছিল।

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় গ্রন্থ দেখায়, কীভাবে সেই একই নাম পরে ডেমোনিক এন্টিটিতে পরিণত হয়।

কিন্তু কুরআন মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে,

মানুষ শেষ পর্যন্ত কার সামনে মাথা নত করবে, সত্যিকারের রবের সামনে, নাকি যুগে যুগে মানুষের তৈরি মিথ্যা উপাস্যদের সামনে?

আজই যুক্ত হও পাঙ্গাশ পুকুরে..

নিয়মিত নটিফিকেশন পেতে নতুন নতুন আর্টিকেলের আজ ই যুক্ত হও, মনারা। মিস যাবে না একটা আর্টিকেলও।

We don’t spam!