১
ঢাকায় আমার ঠিকনা বলতে ছিল মিরপুরের ভেতরে পুরোনো একটা পাঁচতলা বাড়ির চিলেকোঠা। নিচ থেকে দেখলে মনে হতো ছাদটার ওপর কেউ হুট করে একটা ছোট্ট ঘর বসিয়ে দিয়েছে। টিনের চাল। বর্ষায় এত জোরে বৃষ্টি পড়ত যে ফোনে কথা বলতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে হতো। গরমকালে দুপুরে ছাদটা এমন আগুন হয়ে উঠত, মনে হতো সূর্যটা বুঝি টিনের ওপর বসে আছে।
ভাড়াটা কম ছিল। আমার মতো মানুষের জন্য কমই যথেষ্ট।
ঘরে একটা খাট, বাঁকা হয়ে যাওয়া একটা টেবিল, তিন পা সমান আর এক পা ভাঙা চেয়ার, বই রাখার নামে দুটো ইটের ওপর একটা কাঠের তক্তা। জানালাটা ছোট। তবু ওই জানালাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। ওখান থেকে পুরো ঢাকা দেখা যেত না। কিন্তু যতটুকু দেখা যেত, ততটুকুই একটা মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
ফজরের আগে আগে কয়েকটা মসজিদের আজান একসাথে উঠত। তারপর কাক। তারপর দূরে বাসের গর্জন। এরপর মানুষের শব্দ। ঢাকা ঘুম থেকে উঠত না। শুধু শব্দ বদলাত।
আমার ঘুম ভাঙত তারও আগে।
অনেক সময় ঘুম ভাঙার কারণ থাকত না। শুধু মনে হতো পৃথিবীতে আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না। আবার এটাও মনে হতো, আজ কিছু একটা ঘটবে।
ঢাকা শহর এমনই। প্রতিদিন সকালে মনে হয় আজকের দিনটা গতকালের মতোই যাবে। তারপর বিকেলের মধ্যে সবকিছু বদলে যায়।
চিলেকোঠার ঘরটার একটা গন্ধ ছিল। পুরোনো সিমেন্ট, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, ধুলো, বইয়ের কাগজ আর সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া মিলে একটা অদ্ভুত গন্ধ। অনেক বছর পরও যদি চোখ বন্ধ করি, সেই গন্ধটা এখনও পাই।
আমার পাশের ঘরে থাকত নাঈম। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিত। ওর জীবন ছিল রুটিনে বাঁধা। সকাল আটটায় বের হবে, বিকেলে কোচিং, রাতে পড়া। আমার জীবন ঠিক উল্টো। আমি কখন ঘুমাই, কখন বের হই, কখন ফিরি, তার কোনো হিসাব ছিল না। ও মাঝেমধ্যে বলত, “তুই একদিন বিপদে পড়বি।”
আমি হাসতাম।
তখনও জানতাম না, বিপদ মানুষের দরজায় কড়া নাড়ে না। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে বসে থাকে।
সকালে নেমে যেতাম নিচের চায়ের দোকানে। দোকানটার নাম কেউ জানত না। সবাই বলত, কালুর দোকান। কালু ভাইয়ের হাতে বানানো চায়ের স্বাদ কেমন ছিল, সেটা এখন আর মনে নেই। কিন্তু দোকানের বেঞ্চটা মনে আছে। ভাঙা কাচের বয়ামে রাখা বিস্কুট মনে আছে। পত্রিকার ওপর জমে থাকা ধুলো মনে আছে। আর মনে আছে, সেই দোকানে বসেই আমি প্রথম শিখেছিলাম, ঢাকায় খবর কখনও শুধু খবর থাকে না। প্রতিটা খবরের একটা পক্ষ থাকে, একটা বিপক্ষ থাকে, আর মাঝখানে কিছু মানুষ থাকে, যাদের কথা কেউ লেখে না।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। পাশাপাশি দুইটা টিউশনি করি। মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গেলে সবসময় কিছু টাকা কম পড়ে যেত। তাই নতুন বই কেনার আগে পুরোনো বইয়ের দোকানে যেতাম। নতুন শার্ট কেনার আগে ভাবতাম, এই মাসটা আরেকটু চালানো যায় কিনা। জীবন তখন খুব ছোট ছোট অঙ্কে আটকে ছিল।
রাজনীতি নিয়ে আমার বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না।
পত্রিকা পড়তাম। তর্ক শুনতাম। ফেসবুকে পোস্ট দেখতাম। তারপর নিজের কাজে চলে যেতাম। মনে হতো, রাজনীতি বড়লোকদের খেলা। আমাদের মতো মানুষের কাজ হলো মাসের শেষে ভাড়া দেওয়া আর পরের মাস পর্যন্ত টিকে থাকা।
সেদিনও তাই ভেবেছিলাম।
আমি জানতাম না, কয়েক সপ্তাহ পর এই শহরের রাস্তাগুলো আমার নাম জানবে না ঠিকই, কিন্তু আমার দৌড়, আমার ভয়, আমার রক্ত আর আমার সিদ্ধান্তগুলো চিরদিনের মতো বদলে যাবে।
সব গল্পের শুরু নাকি একটা দরজা দিয়ে।
আমার গল্পের শুরু হয়েছিল একটা চিলেকোঠার জানালা দিয়ে।
২
ঢাকার সকাল বলে আলাদা কিছু নেই। এখানে মানুষ ঘুম থেকে ওঠে না, মানুষ দৌড়ানো শুরু করে।
সাড়ে সাতটার দিকে মিরপুর দশ নম্বরের দিকে হাঁটছিলাম। রাস্তায় তখনও রোদের তেজ ওঠেনি। ফুটপাতের দোকানগুলো একে একে খুলছে। কেউ কড়াইতে সিঙ্গারা ছাড়ছে, কেউ পরোটা বেলছে, কেউ চায়ের কাপে দুধ ঢালছে। বাতাসে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ, ডিজেলের ধোঁয়া আর ভেজা মাটির গন্ধ একসাথে মিশে এমন একটা অনুভূতি তৈরি করত, যেটা শুধু ঢাকারই হতে পারে।
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো মানুষগুলোর দিকে তাকাতে আমার ভালো লাগত।
একজন অফিসগামী মানুষ ঘড়ি দেখছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হেডফোন কানে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন মা বাচ্চার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। একজন রিকশাওয়ালা ফুটপাতেই বসে সকালের নাস্তা খাচ্ছে।
প্রতিটা মানুষ কোথাও যাচ্ছে।
কেউ জানে না, কে কোথায় পৌঁছাবে।
আমি প্রায়ই বাসে উঠতাম না। টাকা বাঁচানোর জন্য অনেকটা পথ হেঁটে যেতাম। মিরপুর থেকে শেওড়াপাড়া, শেওড়াপাড়া থেকে আগারগাঁও, কখনো কখনো ফার্মগেট পর্যন্ত। হাঁটতে হাঁটতেই শহরকে চেনা যায়। বাসের জানালা দিয়ে ঢাকা দেখা যায়, কিন্তু হাঁটলে ঢাকা অনুভব করা যায়।
আমার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
দেয়ালে লেখা স্লোগান পড়তাম।
কোথাও কোনো রাজনৈতিক দলের পোস্টার, কোথাও হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি, কোথাও কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন, কোথাও আবার লেখা, “এখানে প্রস্রাব করিবেন না।”
মজার ব্যাপার হলো, শেষের লেখাটার নিচেই সবচেয়ে বেশি দাগ থাকত।
ঢাকা নিয়ম মানতে শেখেনি। ঢাকা নিয়মের সাথে দরকষাকষি করতে শিখেছে।
সেদিন শাহ আলী প্লাজার সামনে এসে দেখি কয়েকজন স্কুলছাত্র দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট। বয়স খুব বেশি হলে ষোলো। তারা খুব উত্তেজিত হয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
একজন বলল, “আজ নামবি তো?”
আরেকজন বলল, “সবাই নামলে আমিও নামব।”
আমি হেঁটে চলে গেলাম।
তাদের কথার মানে বুঝিনি। বুঝতে চেষ্টাও করিনি।
আমার মাথায় তখন অন্য হিসাব।
এই মাসে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দিতে হবে।
মায়ের জন্য কিছু টাকা পাঠাতে হবে।
দুইটা টিউশনির মধ্যে একটা যদি চলে যায়, তাহলে কী হবে?
মানুষ যখন বাঁচার হিসাব কষে, তখন দেশের হিসাব কষার সময় পায় না।
চায়ের দোকানে গিয়ে বসতেই কালু ভাই পত্রিকাটা এগিয়ে দিল।
“দেখছো?”
আমি শিরোনামের দিকে তাকালাম। বড় বড় অক্ষরে দুর্ঘটনার খবর।
কালু ভাই মাথা নাড়ল।
“প্রতিদিনই মানুষ মরে। দুইদিন পরে কেউ মনে রাখে না।”
আমি কিছু বললাম না।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। রাস্তার ওপাশে একটা স্কুলবাস দাঁড়িয়ে ছিল। কয়েকজন বাচ্চা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তারা হাসছে। কেউ হাত নেড়ে কিছু একটা বলছে।
আমি জানতাম না, কয়েক দিনের মধ্যেই এই শহরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে, একটা বাস কত দ্রুত চলছিল তা না, একটা মানুষের জীবন কত সস্তা।
চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম।
সেদিনের সকালটা অন্য দিনের মতোই ছিল।
শুধু ঢাকা চুপচাপ অপেক্ষা করছিল।
কিসের জন্য, তখনও আমি জানতাম না।
৩
আমি সবসময় ভিড় এড়িয়ে চলতাম।
ঢাকায় বাঁচতে হলে ভিড়ের ভেতর থাকতে হয়, আবার ভিড়কে এড়িয়ে চলতেও জানতে হয়। এই শহরে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাটাও অনেক বড় অপরাধ।
সেদিন দুপুরে টিউশনি শেষ করে বেরিয়েছি। রোদটা কেমন যেন সাদা হয়ে ছিল। বাতাস নেই। গাছের পাতাও নড়ছে না। রাস্তার ওপর গরম এমনভাবে কাঁপছিল যে দূরের বাসগুলোকে ঝাপসা লাগছিল।
শেওড়াপাড়া মোড়ে এসে দেখি রাস্তা আটকে কয়েকশো ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্কুল ড্রেস।
কারও হাতে প্ল্যাকার্ড।
কারও হাতে বাঁশের লাঠিতে বাঁধা সাদা কাপড়।
কেউ চিৎকার করছে।
কেউ মোবাইলে লাইভ করছে।
আমি ফুটপাত ধরে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলাম।
আমার মাথায় তখনও একটাই চিন্তা।
বিকেল পাঁচটার মধ্যে দ্বিতীয় টিউশনিতে পৌঁছাতে হবে।
দেরি হলে বাচ্চার বাবা আবার মুখ গোমড়া করে থাকবে।
ঠিক তখনই একজন আমার হাত চেপে ধরল।
“ভাই, এদিকে যাবেন না।”
ছেলেটার বয়স সতেরোও হবে না। কপালে ঘাম। চোখ দুটো অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল।
আমি বললাম, “কেন?”
সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাস আসতে পারে।”
কথাটা শুনে আমি হেসে ফেললাম।
বাস তো রাস্তাতেই আসবে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর বুঝলাম, সে বাসের কথা বলেনি। সে বলছিল ভয়কে।
হঠাৎ চারদিক থেকে একটা শব্দ উঠল।
প্রথমে মনে হলো বাতাস বইছে।
তারপর বুঝলাম, শত শত গলা একসাথে স্লোগান দিচ্ছে।
আমি এর আগে এত মানুষের একসাথে চিৎকার খুব কাছ থেকে শুনিনি।
স্লোগানের শব্দে আশপাশের দোকানের কাঁচ কেঁপে উঠছিল।
কেউ একজন একটা বোতল পানি এগিয়ে দিল।
কেউ বলল, “ভাই, একটু দাঁড়ান।”
কেউ আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির কাগজপত্র দেখছে।
অদ্ভুত একটা দৃশ্য।
পুলিশ নেই।
ট্রাফিক পুলিশ নেই।
তবু রাস্তা চলছে।
যারা গতকাল পর্যন্ত স্কুলে ক্লাস করছিল, তারা আজ বাস থামিয়ে লাইসেন্স দেখছে।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
কৌতূহল মানুষকে যতবার বিপদে ফেলেছে, ভয় ততবার ফেলতে পারেনি।
একটা লোক মোটরসাইকেল নিয়ে এল।
একজন ছাত্র বলল, “লাইসেন্স দেখান।”
লোকটা হেসে বলল, “তোরা পুলিশ নাকি?”
ছেলেটা শান্ত গলায় বলল, “না। নাগরিক।”
লোকটা আর কিছু বলল না।
পকেট থেকে লাইসেন্স বের করে দিল।
আমি জানি না কেন, কথাটা আমার মাথার ভেতর আটকে গেল।
“না। নাগরিক।”
ঢাকায় এই শব্দটা খুব কম মানুষ ব্যবহার করে।
আমরা নিজেদের ভোটার বলি, ছাত্র বলি, কর্মী বলি, নেতা বলি, সমর্থক বলি।
নাগরিক বলি না।
হঠাৎ মনে হলো, শহরটা কয়েক দিনের জন্য নিজের মালিকানা বদলে ফেলেছে।
এই রাস্তাগুলো আর শুধু বাসের নয়।
এই ফুটপাতগুলো আর শুধু হকারদের নয়।
এই শহরটা যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য অন্য কারও হাতে চলে গেছে।
আমি মোবাইল বের করে একটা ছবি তুললাম।
খুব সাধারণ একটা ছবি।
রাস্তার মাঝখানে কয়েকজন স্কুলছাত্র দাঁড়িয়ে আছে।
তখনও জানতাম না, বহু বছর পর ওই ছবিটাই আমি শতবার দেখব।
আর প্রতিবারই ভাবব, মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার আগে পৃথিবী ঠিক এমনই স্বাভাবিক দেখায়।
৪
হাঁটতে হাঁটতে আবার সামনে এগোলাম। রাস্তায় মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। কেউ কোনো নির্দেশ দিচ্ছে না, তবু সবাই যেন জানে কী করতে হবে। বাস থামছে, কাগজপত্র দেখা হচ্ছে, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অ্যাম্বুলেন্স এলে সবাই একসঙ্গে রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। এই শহরকে আমি এতদিন শুধু বিশৃঙ্খলা করতে দেখেছি। সেদিন প্রথম দেখলাম, বিশৃঙ্খল শহরও চাইলে নিজের ভেতর শৃঙ্খলা খুঁজে নিতে পারে।
বিকেলের রোদ তখন একটু নরম হয়েছে। ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে কালো চশমা পরা এক লোক লাইভ করছিল। তার আশপাশে কয়েকজন জড়ো হয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে নিজেদেরই শহর দেখছিল। এই দৃশ্যটাও অদ্ভুত লেগেছিল। মানুষ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকেও ঘটনাটা আবার পর্দার ভেতর থেকে দেখছে। যেন বাস্তবকে বিশ্বাস করার আগে তার একটা ডিজিটাল প্রমাণ দরকার।
আমি টিউশনির ছাত্রের বাবাকে ফোন করলাম। তিনি ফোন ধরতেই বললাম, “আজকে হয়তো আসতে পারব না।”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “সমস্যা নেই। আজকে কেউই ঠিকমতো কোথাও যেতে পারছে না।”
ফোনটা কেটে পকেটে রাখলাম। অদ্ভুত একটা হালকা অনুভূতি হলো। মনে হলো, আজ বিকেলটা হঠাৎ করেই আমার হয়ে গেছে। কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই। কেউ অপেক্ষা করছে না। আমি শুধু হাঁটছি, আর একটা শহরকে বদলে যেতে দেখছি।
হঠাৎ ভিড়ের ভেতর একটা পরিচিত মুখ চোখে পড়ল।
রাকিব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে একই বেঞ্চে বসতাম। তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। ও আমাকে দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। মুখভর্তি ঘাম, শার্টের হাতা গুটানো, চোখে ঘুমহীন কয়েকটা দিনের ছাপ।
“তুই এখানে?”
আমি হেসে বললাম, “এই প্রশ্নটা তো আমিও করতে পারি।”
রাকিব মাথা নেড়ে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। একটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আজকে ক্লাসে গেছিলি?”
“না। টিউশনি ছিল।”
সে আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, “ক্লাস এখন রাস্তায় হচ্ছে।”
আমি কথাটার উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু সিগারেটে টান দিলাম। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে রোদের ভেতর মিলিয়ে গেল।
রাকিব অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে বলল, “জানিস, আমার মনে হচ্ছে আমরা একটা সময়ের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। এখন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু দশ বছর পরে সবাই এই কয়েকটা দিনের কথা বলবে।”
আমি হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
পারলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে কোথাও থেকে আবার স্লোগানের ঢেউ উঠে এলো। প্রথমে সামনে, তারপর ডানদিকে, তারপর আরও দূরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো রাস্তাটা যেন একই ছন্দে দুলতে শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা অনুভূতি জমছিল। ভয়ও না, উত্তেজনাও না। বরং মনে হচ্ছিল, আমি ধীরে ধীরে এমন একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, যেটা একবার পার হলে আর আগের জীবনে ফিরে যাওয়া যায় না।
৫
সেদিন আর বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। আকাশে রোদের রঙ বদলাচ্ছিল, কিন্তু শহরের ভেতরের উত্তাপ যেন আরও বাড়ছিল। রাকিব সিগারেটের শেষ টান দিয়ে ফিল্টারটা পায়ের নিচে পিষে বলল, “চল, শাহবাগে যাই।”
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম।
“এখন?”
“হ্যাঁ। এখনই।”
“কেন?”
রাকিব হেসে ফেলল। সেই হাসিটা আনন্দের ছিল না। বরং এমন একটা হাসি, যেটা মানুষ দেয় যখন নিজের কাছেও উত্তরটা পরিষ্কার থাকে না।
“সবাই যাচ্ছে।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এত মানুষকে আমি আগে কখনও একই দিকে হাঁটতে দেখিনি। আশ্চর্যের বিষয়, কারও মুখে আতঙ্ক নেই। আবার উৎসবের আনন্দও নেই। প্রত্যেকের চোখে এক ধরনের জেদ। যেন তারা সবাই আলাদা মানুষ, অথচ একই চিন্তার ভেতর দিয়ে হাঁটছে।
মিরপুর থেকে শাহবাগের রাস্তা আমার বহুবার যাওয়া। ক্লাসের জন্য, বইমেলার জন্য, টিএসসিতে আড্ডার জন্য, নীলক্ষেতে পুরোনো বই কিনতে। কিন্তু সেদিন পথটা অন্যরকম লাগছিল। শহরের প্রতিটা মোড়ে ছোট ছোট দল দাঁড়িয়ে আছে। কেউ খবর নিচ্ছে, কেউ ফোনে কারও অবস্থান জানাচ্ছে, কেউ বোতলে পানি ভরছে। কয়েকজন রিকশাওয়ালা ভাড়া না নিয়েই ছাত্রদের এগিয়ে দিচ্ছে। এক দোকানি রাস্তার পাশে একটা বড় জগে শরবত বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে আসছে, তাকে এক গ্লাস করে ধরিয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা শহরকে আমি এতদিন শুধু নিজের জন্য লড়তে দেখেছি। সেদিন প্রথম মনে হলো, শহরটা যেন নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর জন্য একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আমরা ফার্মগেটের দিকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাস্তার দুই পাশে মানুষ। ফুটওভার ব্রিজের ওপর মানুষ। বাসের ছাদে মানুষ। কেউ জাতীয় পতাকা কাঁধে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ স্লোগান দিচ্ছে। কেউ শুধু চুপচাপ চারদিকে তাকিয়ে আছে। ভিড়ের মধ্যেও অদ্ভুত এক শৃঙ্খলা। কেউ কাউকে চেনে না, তবু সবাই যেন পরস্পরের দায়িত্ব নিয়ে হাঁটছে।
রাকিব আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “দেখ, ইতিহাস আসলে বইয়ে লেখা হয় না। আগে রাস্তায় লেখা হয়। পরে বইয়ের মানুষরা এসে সেটা কপি করে।”
কথাটা শুনে হেসে ফেললাম। তারপরই বুঝলাম, আমি অনেকক্ষণ ধরে হাসিনি। হয়তো কয়েক দিন। হয়তো আরও বেশি।
হঠাৎ সামনে থেকে একটা ছেলে দৌড়ে এলো। বয়স আঠারো কি উনিশ। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “পেছনের দিকে একটু জায়গা করেন। একজন অসুস্থ হয়ে গেছে।”
কোনো নির্দেশ ছাড়াই মানুষ দুদিকে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাঝখানে সরু একটা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। দুজন ছেলেমেয়ে একজন অজ্ঞান ছাত্রকে ধরে নিয়ে চলে গেল। ভিড় আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেল।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মনে হচ্ছিল, শহরটা আজ অন্য কারও হাতে নেই। শহরটা আজ নিজের হাতেই ফিরে এসেছে।
সেদিন আমি প্রথমবার বুঝলাম, একটা আন্দোলনের শক্তি শুধু তার স্লোগানে না। তার শক্তি লুকিয়ে থাকে সেই মানুষগুলোর মধ্যে, যারা একে অপরের নাম জানে না, তবু বিপদের সময় কাঁধ বাড়িয়ে দেয়।
সন্ধ্যার আলো তখন পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। শাহবাগের দিক থেকে আবার স্লোগানের ঢেউ ভেসে আসছে। আমি আর রাকিব ধীরে ধীরে সেই শব্দের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
আমার তখনও ধারণা ছিল, আমি শুধু একটা আন্দোলন দেখতে যাচ্ছি।
জানতাম না, সেদিনের সেই হাঁটাই আমার পুরোনো জীবনের শেষ হাঁটা।
৬
শাহবাগে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত নেমে গেছে। দিনের ঢাকা আর রাতের ঢাকা কোনোদিন এক শহর ছিল না। দিনের শহরটা হিসাব জানে, অফিস জানে, ট্রাফিক জানে। রাতের শহরটা মানুষকে অন্যরকম করে দেয়। রাত হলেই মুখের ভদ্রতা একটু নরম হয়ে আসে, কথাগুলো একটু সোজা হয়ে যায়। আর সেই রাত যদি হয় আন্দোলনের রাত, তাহলে শহরের প্রতিটা বাতির নিচে আলাদা একটা গল্প জন্ম নেয়।
শাহবাগ মোড়ে পা রেখেই বুঝলাম, টেলিভিশনে যা দেখানো হয়, বাস্তব তার চেয়ে অনেক বড়। মানুষ শুধু রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, ফুটপাতে বসে আছে, ডিভাইডারের ওপর বসে আছে, দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে কথা বলছে। কেউ পোস্টার লিখছে, কেউ পানির বোতল বিলিয়ে দিচ্ছে, কেউ আহত কারও হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে। এত মানুষ, অথচ কোথাও সেই পরিচিত বিশৃঙ্খলাটা নেই। যেন সবাই অদৃশ্য কোনো নিয়ম মেনে চলছে।
রাকিব আমাকে টেনে নিয়ে গেল টিএসসির দিকে। রাস্তার পাশে কয়েকজন গিটার বাজাচ্ছে। কেউ কবিতা পড়ছে। একটু দূরে এক বৃদ্ধ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছেন। তাঁর চোখে পানি। কেউ খেয়াল করছে না। তিনি নিজেও চান না কেউ খেয়াল করুক। আমার মনে হলো, মানুষটা হয়তো অন্য কোনো সময়ও এমন একটা রাস্তা দেখেছিলেন। হয়তো অনেক বছর আগে। ইতিহাস মাঝে মাঝে নিজের পোশাক বদলায়, কিন্তু মুখটা একই রাখে।
টিএসসির সামনের চায়ের দোকানগুলো তখনও খোলা। প্লাস্টিকের কাপ হাতে নিয়ে আমরা দুজন সিঁড়িতে বসে পড়লাম। চারদিকে মানুষের গুঞ্জন। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে, কেউ বলছে এই আন্দোলন কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ বলছে এটা শুধু শুরু। আমি চুপচাপ শুনছিলাম। আমার বলার মতো কিছু ছিল না। আমি এখনও নিজেকে এই গল্পের বাইরের মানুষই ভাবছিলাম।
রাকিব হঠাৎ বলল, “জানিস, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ কারা?”
আমি তাকালাম।
সে বলল, “যারা ভাবে তারা রাজনীতি করে না।”
আমি হেসে বললাম, “আমি তো তাদের একজন।”
রাকিবও হাসল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “না। তুই ছিলি।”
কথাটা শুনে আর হাসতে পারলাম না।
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র গোল হয়ে বসে পোস্টার আঁকছে। একজন রং মিশিয়ে দিচ্ছে, আরেকজন অক্ষর লিখছে। তাদের হাসি দেখে মনে হচ্ছিল না, তারা কোনো ভয়ংকর সময়ের মধ্যে আছে। বরং মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর তারা এমন একটা কাজ করছে, যার জন্য ভবিষ্যতে নিজেদের কাছে লজ্জা পেতে হবে না।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, মানুষের সংখ্যা তত বাড়ছিল। মিছিল আসছে, মিছিল চলে যাচ্ছে। স্লোগানের ঢেউ একবার ডান দিক থেকে উঠছে, আবার কয়েক মিনিট পর বাঁ দিক থেকে। এই শব্দেরও একটা ছন্দ আছে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, আমি আর শুধু শুনছি না। কখন যে অজান্তে ঠোঁট নড়ে উঠছে, নিজেও বুঝতে পারছি না।
সেই মুহূর্তেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
আমি কি এখনও দর্শক?
নাকি অজান্তেই ভিড়ের একজন হয়ে গেছি?
চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটা হঠাৎ খুব দূরের কোনো জায়গা মনে হলো। সকালে যে মানুষটা টিউশনি আর ভাড়ার হিসাব নিয়ে বের হয়েছিল, সে যেন আর আগের মানুষটা নেই। শহর আমাকে কিছু শেখাচ্ছিল। ধীরে ধীরে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
সেদিন রাত আড়াইটার দিকে শাহবাগ থেকে বের হয়েছিলাম। বাস ছিল না। রিকশা ছিল না। আমরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেটের দিকে রওনা দিলাম। রাস্তার বাতিগুলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। ক্লান্তি ছিল, ক্ষুধা ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল একটা অনুভূতি, যেটার নাম তখনও জানতাম না।
অনেক বছর পরে বুঝেছি, সেই রাতেই প্রথমবার আমার ভেতরে বিপ্লব জন্ম নিয়েছিল। সেটা রাস্তায় নয়, স্লোগানে নয়, মানুষের ভিড়েও নয়। সেটা জন্ম নিয়েছিল নিজের ভেতরের নিশ্চিন্ত মানুষটার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
৭
রাত তিনটার দিকে ঢাকা অন্য এক শহরে পরিণত হয়। দিনের সব তর্ক, সব চিৎকার, সব হর্ন কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। শুধু দূরে কোথাও একটা ট্রাকের শব্দ, কয়েকটা কুকুরের ডাক, আর রাস্তার বাতির নিচে লম্বা হয়ে পড়ে থাকা ছায়া। আমি আর রাকিব ফার্মগেট থেকে মিরপুরের দিকে হাঁটছিলাম। বাস নেই, রিকশা নেই, সিএনজিও গোনা কয়েকটা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের কারও তাড়া ছিল না। যেন বাড়ি ফিরতে দেরি হলে খুব একটা ক্ষতি হবে না।
হাঁটতে হাঁটতে রাকিব হঠাৎ বলল, “তুই কি কখনও ভেবেছিস, এই শহরে আমাদের নিজের বলতে কী আছে?”
আমি উত্তর দিলাম না। প্রশ্নটা খুব সহজ ছিল, কিন্তু উত্তরটা ছিল না।
আমার ছিল একটা ভাড়া করা চিলেকোঠা। মাসের শেষে টাকা দিতে না পারলে যেটা আর আমার থাকত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, কয়েকটা বই, দুটো শার্ট, একটা ব্যাগ। এতেই একটা মানুষের জীবন আটকে থাকতে পারে, ভাবলে নিজেরই অবাক লাগত।
রাকিব আবার বলল, “আমরা ঢাকায় থাকি কিন্তু ঢাকা আমাদের না।”
কথাটা শুনে আমার মনে হলো, শহরটাকে আমরা সবসময় ব্যবহার করেছি। রাস্তা ব্যবহার করেছি, ফুটপাত ব্যবহার করেছি, বাস ব্যবহার করেছি, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করেছি। কিন্তু কোনোদিন শহরটার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ভাবিনি। যেন ঢাকা একটা হোটেল, যেখানে কিছুদিন থেকে একদিন চলে যাব।
ইন্দিরা রোড পার হওয়ার সময় দেখি রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান এখনও খোলা। টিনের চালের নিচে হলুদ বাল্ব জ্বলছে। দোকানদার আমাদের দেখে কিছু না বলেই দুই কাপ চা বানাতে শুরু করল। মনে হলো, সে বুঝে গেছে আমরা কোথা থেকে ফিরছি।
চা হাতে দিয়ে সে শুধু বলল, “অনেক মানুষ আছিল?”
রাকিব মাথা নেড়ে বলল, “অনেক।”
লোকটা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কাপ ধুতে ধুতে খুব আস্তে বলল, “এই শহরে মানুষ এক হইলে বড় ভয় লাগে।”
আমি বুঝতে পারলাম না, কথাটা ভয় থেকে বলল, না আশাবাদ থেকে।
চা শেষ করে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। রাতের বাতাসে দিনের গরমটা আর নেই। কোথা থেকে যেন কদম ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। ঢাকা মাঝে মাঝে এমন করে। সারাদিন ধুলো, ধোঁয়া আর ক্লান্তির নিচে চাপা পড়ে থাকা শহরটা গভীর রাতে হঠাৎ নিজের আসল গন্ধটা ফিরিয়ে আনে। তখন বিশ্বাসই হয় না, এই শহরেই কয়েক ঘণ্টা আগে হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিচ্ছিল।
মিরপুরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছে। পূর্ব দিকটা হালকা নীল হয়ে উঠছে। ছাদের ওপর দু-একটা কাক বসেছে। দূরের মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের গলা ভেসে এলো। আমি সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে চিলেকোঠায় উঠলাম। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, ঘরটা এক রাতেই ছোট হয়ে গেছে।
টেবিলের ওপর খোলা বইটা এখনও আগের পাতাতেই পড়ে আছে। চেয়ারটা একই জায়গায়। জানালার বাইরে একই শহর।
কিন্তু আমি আর আগের মানুষটা নই।
সেদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রথমবার ডায়েরিটা খুলেছিলাম। অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে থেকেও কিছু লিখতে পারছিলাম না। শেষে মাত্র একটা লাইন লিখেছিলাম।
“আজ ঢাকা আমাকে চিনে ফেলেছে।”
তখনও জানতাম না, মানুষ যখন শহরের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে ফেলে, শহরও তাকে আর সহজে ছেড়ে দেয় না।
৮
আমি প্রায় দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়েছিলাম।
ঘুম ভাঙল দরজায় ধাক্কার শব্দে।
প্রথমে ভেবেছিলাম বাড়িওয়ালা। মাসের শেষের দিকে তিনি এমনিই দু-একবার উঠে আসেন। ভাড়ার কথা বলেন না, শুধু দরজায় দাঁড়িয়ে কাশেন। সেই কাশির ভেতরেই সব কথা বলা হয়ে যায়।
কিন্তু আজকের ধাক্কাটা অন্যরকম।
অস্থির।
একটার পর একটা।
আমি দরজা খুলতেই নাঈম প্রায় আমাকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুখে ঘাম, শার্ট ধুলোয় মাখা, নিঃশ্বাস এলোমেলো।
“দরজা লাগা।”
আমি কিছু না বুঝেই ছিটকিনি তুলে দিলাম।
নাঈম জানালার কাছে গিয়ে নিচে তাকাল। তারপর খুব আস্তে পর্দাটা টেনে দিল।
আমি বললাম, “কী হইছে?”
সে আমার দিকে তাকাল। এমন চোখ আমি তার কোনোদিন দেখিনি।
“রাত থেইকা ধরতাছে।”
কথাটা শুনে ঘরটা হঠাৎ ছোট হয়ে গেল।
আমি কিছু বললাম না।
নাঈম বিছানায় বসে হাঁপাচ্ছিল। তারপর মোবাইলটা এগিয়ে দিল।
একটার পর একটা ছবি।
একটার পর একটা ভিডিও।
কোথাও ছাত্রদের টেনে ভ্যানে তোলা হচ্ছে। কোথাও হোস্টেলের সামনে পুলিশ। কোথাও আবার রাতের অন্ধকারে কয়েকজন ছেলেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাকের মানুষ।
সব ভিডিও একই কথা বলছিল।
শহর রাতারাতি বদলে গেছে।
আমি বললাম, “রাকিব?”
নাঈম মাথা নেড়ে বলল, “ফোন বন্ধ। সকাল থেইকা পাইতেছি না।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
কাল রাতেও যে মানুষটা আমার পাশে হাঁটছিল, আজ তার কোনো খোঁজ নেই।
জানালার ফাঁক দিয়ে নিচে তাকালাম।
গলির মোড়ে দুটো পুলিশের পিকআপ দাঁড়িয়ে।
কয়েকজন কনস্টেবল আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে। মাঝে মাঝে কারও বাসার দিকে আঙুল দেখাচ্ছে। দূর থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না তারা কাকে খুঁজছে। কিন্তু পুরো মহল্লার বাতাসে একটা চাপা ভয় ছড়িয়ে গেছে।
সামনের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটাও আজ স্বাভাবিকের চেয়ে আস্তে কথা বলছেন।
নিচের চায়ের দোকানে আড্ডা নেই।
রিকশাও কম।
ঢাকা শহরকে আমি কখনও এত চুপচাপ দেখিনি।
বিকেলের দিকে খবর এলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজনকে তুলে নেওয়া হয়েছে।
কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না।
কেউ বলছে থানায়।
কেউ বলছে গোয়েন্দা কার্যালয়ে।
কেউ বলছে, কোথাও না।
শুধু মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যার পর রাকিবের একটা মেসেজ এল।
মাত্র তিনটা শব্দ।
“ফোন দিস না।”
তারপর আর কিছু না।
আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
উত্তরও দিলাম না।
কারণ উত্তর দিলে সেটাও হয়তো কারও হাতে চলে যাবে।
রাত নামতেই নাঈম বলল, “তুই আজ এই রুমে থাকবি না।”
“কোথায় যামু?”
“যেখানে হোক। কিন্তু এখানে না।”
“কেন?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “কাল তোকে শাহবাগে অনেকেই দেখছে। তোর ছবি অনেকের ফোনে আছে। এখন কে কোন ছবি দিয়া কাকে খুঁজে বের করে, কইতে পারিস?”
আমি হাসার চেষ্টা করলাম।
“আমি এমন কে?”
নাঈম এবার বিরক্ত হয়ে উঠল।
“সমস্যা এইটাই। এই শহরে কখন কে গুরুত্বপূর্ণ হইয়া যায়, কেউ জানে না।”
আমি আর কথা বললাম না।
রাত দশটার দিকে একটা ব্যাগে দুটো জামা, একটা ডায়েরি আর কয়েকটা বই গুঁজে বেরিয়ে পড়লাম।
চিলেকোঠার দরজাটা বন্ধ করার সময় একবার হাত বুলিয়ে দিলাম টিনের গায়ে।
মনে হচ্ছিল, কয়েক দিনের জন্য যাচ্ছি।
পরে বুঝেছিলাম, মানুষ যখন নিজের ঘর থেকে লুকিয়ে বের হয়, তখন সে আর আগের ঠিকানায় ফিরে আসে না।
সেই রাতেই শুরু হয়েছিল আমার আত্মগোপনের জীবন।
আর সেই রাতেই প্রথমবার বুঝেছিলাম, আন্দোলন শুধু রাজপথে হয় না।
আন্দোলন শুরু হয় তখনই, যখন নিজের নামটাকেও লুকিয়ে রাখতে হয়।
৯
সেদিন রাতেই আমি মিরপুর ছেড়ে বের হয়ে গেলাম। কোথায় যাচ্ছি, সেটা আমি নিজেও জানতাম না। শুধু জানতাম, নিজের ঘরে থাকা আর নিরাপদ নয়। ঢাকা শহরে মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম হলো, তার একটা ঠিকানা আছে। আসলে ঠিকানাও মানুষকে ছেড়ে চলে যায়। রাত যত গভীর হয়, তত বুঝতে পারা যায়, এই শহরে লুকিয়ে থাকার জায়গা আছে, কিন্তু নিরাপদ থাকার জায়গা নেই।
নাঈম আমাকে নিয়ে গেল মোহাম্মদপুরের ভেতরের একটা পুরোনো বাড়িতে। চারতলার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। সেখানে আগে থেকেই তিনজন ছাত্র ছিল। একজন বুয়েটের, একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের, আরেকজনকে আমি চিনতাম না। কেউ কারও পুরো নাম জিজ্ঞেস করল না। কেউ বাড়ি কোথায়, সেটাও জানতে চাইল না। এই কয়েক দিনে আমরা সবাই শিখে গিয়েছিলাম, কম জানা কখনও কখনও বেশি নিরাপদ।
ফ্ল্যাটটার জানালাগুলো সারাক্ষণ বন্ধ থাকত। পর্দা সরানো নিষেধ। রাতে আলো জ্বালালে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে যেন না যায়, সেই জন্য খবরের কাগজ টেপ দিয়ে কাঁচে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দরজায় কেউ নক করলে সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেওয়া হতো না। আগে ফোন, তারপর সংকেত, তারপর দরজা। যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের নিয়মগুলো আমরা অজান্তেই শিখে ফেলছিলাম।
সারাদিন আমরা মোবাইল ফোনে খবর দেখতাম। কে ধরা পড়েছে, কে নিখোঁজ, কোথায় আবার মিছিল হয়েছে, কোথায় লাঠিচার্জ হয়েছে। ফেসবুক খুললেই পরিচিত মুখ। গত সপ্তাহেও যাদের সঙ্গে ক্লাস করেছি, ক্যান্টিনে চা খেয়েছি, তাদের কারও ছবি এখন “নিখোঁজ”, কারও ছবি “গ্রেপ্তার”, কারও ছবি “খোঁজা হচ্ছে” লেখা পোস্টারে ঘুরছে। মানুষ এত দ্রুত সংবাদ হয়ে যেতে পারে, আগে কোনোদিন বুঝিনি।
তৃতীয় দিনের বিকেলে রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। অচেনা একটা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো কথা নেই। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর খুব আস্তে রাকিব বলল, “বাঁচা আছি। কিন্তু বেশি কথা বলা যাবে না।”
আমি এতক্ষণে প্রথমবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
“তুই কোথায়?”
“জানলে তোরও সমস্যা হবে।”
“কবে দেখা হবে?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সে বলল, “সব ঠিক হলে।”
লাইন কেটে গেল।
“সব ঠিক হলে”, কথাটা কয়েক দিন ধরে মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। কী ঠিক হবে? কখন ঠিক হবে? কে ঠিক করবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না।
আত্মগোপনে থাকার চতুর্থ দিন সকালে নাঈম হঠাৎ একটা ছবি আমার সামনে ধরে বলল, “এটা তুই না?”
ছবিটা দেখে প্রথমে নিজেকেই চিনতে পারিনি। শাহবাগের মোড়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে একটা পানির বোতল। সামনে কয়েকজন স্কুলছাত্র। পেছনে জাতীয় পতাকা। ছবিটা এমন এক মুহূর্তে তোলা, যখন মনে হচ্ছিল আমি কাউকে কিছু বলছি। অথচ আমি জানতাম, সেদিন আমি শুধু একজনের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম।
ছবিটা ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষের ফোনে ঘুরছে।
কেউ লিখেছে, “অজানা এক ছাত্রের সাহস।”
কেউ লিখেছে, “নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ।”
কেউ আবার এমনসব গল্প বানিয়েছে, যা আমার নিজের জীবনেও কখনও ঘটেনি।
আমি ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল। মানুষ যখন একজনকে চেনে না, তখন তাকে নিয়ে নিজের মতো করে একটা মানুষ বানিয়ে নেয়। সেই মানুষটা আসল মানুষটার চেয়ে অনেক বড়, অনেক সাহসী, অনেক নিখুঁত। অথচ আমি জানতাম, ছবির ভেতরের ছেলেটা ভয় পায়, অনিশ্চয়তায় ভোগে, রাতে ঘুম ভেঙে যায়।
নাঈম বলল, “ছবিটা এখন সমস্যা হইয়া গেছে।”
আমি হেসে বললাম, “একটা ছবি দিয়া কী হবে?”
সে উত্তর দিল না। শুধু ফোনটা আমার হাতে দিয়ে আরেকটা পোস্ট দেখাল। সেখানে আমার ছবিটা লাল দাগ দিয়ে ঘেরা। নিচে লেখা, “এই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য থাকলে জানাবেন।”
হাসিটা আমার মুখ থেকে মিলিয়ে গেল।
প্রথমবার মনে হলো, আমি আর শুধু ভিড়ের একজন নই। কেউ একজন আমাকে আলাদা করে দেখতে শুরু করেছে। আর সেই দেখাটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের শুরু।
১০
গ
পঞ্চম দিনের সকালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর লুকিয়ে থাকব না।
আত্মগোপন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু ধীরে ধীরে ভেতর থেকে মেরে ফেলে। জানালার ফাঁক দিয়ে শহর দেখা যায়, শহরের অংশ হওয়া যায় না। পাঁচ দিন ধরে আমি শুধু খবর দেখেছি। কে আহত, কে ধরা পড়েছে, কোথায় আবার মিছিল হয়েছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে, আমি যেন নিজের জীবনটাকে দূর থেকে দেখছি।
নাঈম বারবার নিষেধ করছিল।
“আর দুইদিন থাক। পরিস্থিতি ঠান্ডা হইলে যাস।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষা করলে একসময় দেখবি, আন্দোলনটাই ঠান্ডা হয়ে গেছে।”
সে আর তর্ক করল না। শুধু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলল, “ফোন সবসময় অন রাখিস।”
আমি হেসে বললাম, “থাকলে তো ধরব।”
সেই হাসিটাই ছিল সেদিনের শেষ নিশ্চিন্ত মুহূর্ত।
মোহাম্মদপুর থেকে আমি একা বের হয়েছিলাম। ইচ্ছা ছিল মিরপুরে গিয়ে কিছু কাপড় নিয়ে আসব, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাব। সকালটা অদ্ভুত শান্ত ছিল। দোকানপাট খুলছে, মানুষ কাজে যাচ্ছে, বাসের হেলপার চিৎকার করছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই যে এই শহরের বুকের ভেতর আগুন জমে আছে।
আমি শ্যামলীর মোড়ে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছিলাম। তখনই একটা সাদা মাইক্রোবাস এসে ধীরে ধীরে আমার সামনে থামল।
গাড়িটায় কোনো সরকারি চিহ্ন ছিল না।
কাচগুলো কালো।
আমি প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। ঢাকায় এমন শত শত গাড়ি ঘোরে।
দরজা খুলে দুজন লোক নামল। সাধারণ পোশাক। একজন আমার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আপনি কি…?”
সে আমার পুরো নামটা বলল।
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকজন আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে প্রতিবাদ করারও সময় পেলাম না।
“একটু কথা আছে।”
“কী ব্যাপার?”
“গাড়িতে উঠেন।”
“কোথায়?”
“গাড়িতে উঠেন।”
চারপাশে মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল।
কেউ এগিয়ে এল না।
কেউ প্রশ্নও করল না।
ঢাকার মানুষ জানে, কিছু দৃশ্য না দেখার ভান করে বেঁচে থাকতে হয়।
আমি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম।
লোকটা এবার নিচু গলায় বলল, “সমস্যা করবেন না।”
তার গলার স্বরটা শান্ত ছিল, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর এমন একটা অভ্যাস ছিল, যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, এ কাজ সে নতুন করছে না।
আমাকে গাড়ির ভেতরে বসিয়ে দুপাশে দুজন বসল। দরজা বন্ধ হতেই বাইরের শহরটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
আমি জানালা দিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।
শুধু বুঝতে পারছিলাম, একটার পর একটা মোড় ঘুরছে।
কতক্ষণ কেটেছিল জানি না।
সময় তখন আর ঘড়িতে মাপা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ আমার মোবাইলটা নিয়ে নেওয়া হলো।
ব্যাগটাও।
ডায়েরিটা বের করে একজন কয়েক পাতা উল্টে আবার বন্ধ করে রাখল।
তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ছবিটা কে তুলছিল?”
আমি বুঝলাম না।
“কোন ছবি?”
সে মোবাইলের স্ক্রিনটা আমার সামনে ধরল।
শাহবাগের সেই ছবিটা।
যে ছবিটা কয়েক দিন ধরে হাজার হাজার মানুষের ফোনে ঘুরছে।
“এইটা।”
আমি ধীরে বললাম, “জানি না।”
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল, “জানবেন। সময় আছে।”
গাড়িটা আবার চলতে শুরু করল।
প্রথমবার আমার মনে হলো, হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমি বের হতে পারব না।
হয়তো কয়েক দিনও না।
হয়তো আরও অনেক বেশি।
সেদিন দুপুরের পর থেকেই আমার ফোন বন্ধ পাওয়া যেতে লাগল।
বিকেলের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল, আমি নিখোঁজ।
কেউ বলল আমাকে তুলে নেওয়া হয়েছে।
কেউ বলল আমি আত্মগোপনে গেছি।
কেউ বলল সীমান্ত পার হয়ে চলে গেছি।
সত্যিটা তখন শুধু কয়েকজন মানুষ জানত।
আর আমি।
কিন্তু সন্ধ্যার পর এমন একটা ঘটনা ঘটল, যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
যে ছবিটার জন্য আমাকে খুঁজে বের করা হয়েছিল, সেই ছবিটাই আবার শহরের দেয়ালে, মানুষের ফোনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
এবার ছবির নিচে আর কেউ লিখছিল না, “অজানা ছাত্র।”
মানুষ লিখতে শুরু করল,।
“ওকে ফিরিয়ে দাও।” আর সেই চারটি শব্দই ধীরে ধীরে পুরো শহরের নতুন স্লোগানে পরিণত হতে শুরু করল।
১১
আমি পরে জেনেছিলাম, আমার গ্রেপ্তারের খবর প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করেনি।
সবাই ভেবেছিল আমি আত্মগোপনে চলে গেছি। কারণ গত কয়েক দিন ধরেই অনেকেই লুকিয়ে ছিল। কেউ বন্ধুর বাসায়, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আবার শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাই বিকেল পর্যন্ত আমার ফোন বন্ধ থাকলেও কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু সন্ধ্যার পর ঘটনাটা বদলে গেল।
শ্যামলীর মোড়ে একটা ফার্মেসির সিসিটিভি ফুটেজ বের হলো। ঝাপসা ভিডিও। তেমন কিছু বোঝাও যায় না। শুধু দেখা যায়, একটা সাদা মাইক্রোবাস থামে। দুজন লোক নামে। কয়েক সেকেন্ড পর একজন যুবককে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। তারপর গাড়িটা চলে যায়।
ভিডিওটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শত শত মানুষের ফোনে ছড়িয়ে পড়ল।
তারও কিছুক্ষণ পর কেউ একজন সেই ভিডিওর সঙ্গে শাহবাগের ছবিটা পাশাপাশি জুড়ে দিল।
এক পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি মানুষের ভিড়ে।
অন্য পাশে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
দুটি ছবির মাঝখানে মাত্র একটা লাইন।
“ছেলেটাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে?”
ঢাকা খুব অদ্ভুত শহর।
এই শহরে একটা খবর যেমন দ্রুত হারিয়ে যায়, তেমনি কোনো কোনো খবর মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হয়।
সেদিন রাতের পর থেকে আমার নাম আর শুধু আমার ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে আমার ছবি সাঁটা হতে শুরু করল।
হাতে আঁকা পোস্টারে লেখা হলো,
“তাকে আদালতে হাজির করো।”
“নিখোঁজ কেন?”
“ওকে ফিরিয়ে দাও।”
আমি তখন এসবের কিছুই জানতাম না।
একটা ছোট্ট কক্ষে বসে ছিলাম।
জানালা নেই।
ঘড়ি নেই।
দিন আর রাত বোঝার কোনো উপায় নেই।
শুধু দরজা খুলে কেউ খাবার রেখে যায়, আবার নিয়ে যায়।
সময়কে তখন খাবারের প্লেট দিয়ে মাপতে হতো।
প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো দ্বিতীয় দিনে।
একজন কর্মকর্তা সামনে একটা ফাইল খুলে বসেছিলেন। ফাইলের ভেতর কয়েকটা প্রিন্ট করা ছবি। আমার ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, আর সেই ভাইরাল ছবি।
তিনি খুব শান্তভাবে বললেন,
“আপনি কি আন্দোলনের সংগঠক?”
“না।”
“তাহলে সবাই আপনাকে খুঁজছে কেন?”
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি আবার বললেন,
“এই ছবি তোলার পর কী হয়েছে জানেন?”
আমি মাথা নাড়লাম।
তিনি ফাইলটা বন্ধ করে বললেন,
“আপনাকে নিয়ে বাইরে অনেক নাটক হচ্ছে।”
আমি তখনও বুঝতে পারিনি, সেই “নাটক” আসলে কী।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হওয়ার পর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক কনস্টেবল খুব আস্তে বলেছিল,
“ভাই, আপনার জন্য নাকি বাইরে অনেক মানুষ নামছে।”
আমি ভেবেছিলাম লোকটা হয়তো আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
বিশ্বাস করিনি।
কিন্তু তৃতীয় দিনের দুপুরে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে এল শব্দ।
খুব ক্ষীণ।
প্রথমে বুঝতে পারিনি।
তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো।
একসঙ্গে শত শত মানুষের গলা।
কেউ একজন স্লোগান দিচ্ছে।
বাকিরা একসঙ্গে উত্তর দিচ্ছে।
আমি শব্দগুলো ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছিলাম না।
শুধু শেষের চারটা শব্দ বারবার কানে আসছিল।
“ওকে ফিরিয়ে দাও।”
আমি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
লোহার দরজার ওপারে মানুষগুলোকে দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু তাদের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল।
সেই মুহূর্তে প্রথমবার আমার ভয় লাগল।
গ্রেপ্তারের জন্য নয়।
মানুষের জন্য।
কারণ আমি জানতাম, আমি এমন কেউ নই যার জন্য এত মানুষ রাস্তায় নামবে।
কিন্তু তখন আর বিষয়টা আমাকে নিয়ে ছিল না।
আমি একটা মানুষের নাম থেকে ধীরে ধীরে একটা প্রতীকে পরিণত হচ্ছিলাম।
আর ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত হয়তো সেটাই, যখন একজন মানুষ নিজের পরিচয় হারিয়ে একটা প্রতীক হয়ে যায়।
১২
আমার গ্রেপ্তারের চতুর্থ দিন।
সকালে দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভাঙল। আগের দিনের মতোই একজন এসে খাবার রেখে চলে গেল। ঘরের ভেতরের বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ জমে আছে। কত দিন গোসল করিনি, দাড়ি কতটা বড় হয়েছে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে কি না, এসবের কোনো হিসাব তখন আর ছিল না। সময়কে আমি দিন দিয়ে নয়, অপেক্ষা দিয়ে মাপতে শিখে গিয়েছিলাম।
সেদিন জিজ্ঞাসাবাদের ঘরে নিয়ে যেতেই পরিবেশটা অন্যরকম লাগল। আগের সেই আত্মবিশ্বাসী মুখগুলো আর নেই। টেবিলের ওপরে কয়েকটা মোবাইল ফোন রাখা। একটার পর একটা ফোন বেজে উঠছে। কেউ ধরছে, দু-একটা কথা বলেই কেটে দিচ্ছে। ঘরের ভেতরে অদ্ভুত এক চাপা অস্থিরতা।
আমাকে বসিয়ে রাখা হলো প্রায় এক ঘণ্টা। কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু মাঝে মাঝে একজন এসে ফাইল উল্টে দেখছে, আবার চলে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, কোথাও কিছু বদলাচ্ছে। কিন্তু কী বদলাচ্ছে, সেটা জানার কোনো উপায় নেই।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একজনের রাগী গলা ভেসে এলো।
“একটা ছেলের জন্য পুরো শহর অচল হয়ে যাবে নাকি?”
অন্য একজন শান্ত গলায় কী যেন বলল। কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পেলাম না। শুধু বুঝলাম, তর্কটা আমাকে নিয়েই।
অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম, সেদিন সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্লাস বর্জন শুরু হয়েছিল। প্রথমে কয়েকশো ছাত্র। তারপর কয়েক হাজার। দুপুরের দিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে নেমে আসে। তাদের দাবির তালিকা বড় ছিল না। তারা শুধু জানতে চাইছিল, আমাকে কোথায় রাখা হয়েছে। আদালতে হাজির করা হোক, অথবা মুক্তি দেওয়া হোক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় একই পোস্টার, একই ছবি, একই চারটি শব্দ। মানুষ তখন আমার জন্য নয়, একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছিল।
বিকেলের দিকে প্রথমবার আমাকে বাইরে বের করা হলো। চোখে কাপড় বাঁধা হয়নি, কিন্তু চারপাশে এত দ্রুত হাঁটানো হচ্ছিল যে কিছুই বুঝে ওঠার সুযোগ ছিল না। করিডোর পেরিয়ে একটা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা বসে ছিলেন। তাদের মুখে আগের মতো কঠোরতা নেই। বরং এক ধরনের ক্লান্তি।
তাদের একজন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।”
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কথাটা এত সহজভাবে বলা হয়েছিল যে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
“কেন?”
তিনি প্রশ্নটার উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, “বাইরে গিয়ে কোনো ঝামেলা করবেন না।”
আমি আর কিছু বললাম না। কারণ বুঝে গিয়েছিলাম, এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছেও নেই।
সন্ধ্যার একটু আগে ভবনের বাইরে বের হতেই আলোটা চোখে লাগল। কয়েক দিন পর খোলা আকাশ দেখলাম। বাতাসের গন্ধও যেন আলাদা। মানুষের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো এই সাধারণ বাতাসটাই। বন্দি না হলে তার মূল্য বোঝা যায় না।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নাঈম। ওকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারিনি। কয়েক দিনের মধ্যে ছেলেটা যেন কয়েক বছর বুড়িয়ে গেছে। আমাকে দেখেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। কোনো কথা বলল না। শুধু কাঁধটা শক্ত করে ধরে রইল। সেই নীরব আলিঙ্গনেই আমি বুঝে গেলাম, বাইরে এই কয়েক দিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
গাড়িতে ওঠার পর নাঈম ফোনটা আমার হাতে দিল। বলল, “দেখ।”
আমি স্ক্রিন অন করতেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
শত শত মিসড কল।
হাজার হাজার বার্তা।
অচেনা মানুষ লিখেছে, “ভাই, আপনি হাল ছাড়বেন না।”
কেউ লিখেছে, “আপনার জন্য আজ রাস্তায় ছিলাম।”
কেউ শুধু লিখেছে, “স্বাগতম।”
আমি ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিলাম।
নাঈম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “তুই বুঝতেছিস না কী হইছে।”
আমি বললাম, “কী হইছে?”
সে দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল, “তোরে ছাড়াইতে গিয়া মানুষ আর শুধু তোর কথা বলে নাই। এখন তারা পুরো আন্দোলনের কথাই নতুন করে বলতে শুরু করছে।”
গাড়ি তখন শাহবাগের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার দুপাশে এখনও পোস্টার ঝুলছে। কোথাও কোথাও আমার সেই ছবিটা বাতাসে দুলছে। আমি নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি অনুভব করলাম। ছবির মানুষটার সঙ্গে আমার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, কারাগার থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু আর ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ আমাকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখান থেকে আর ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
চিলেকোঠার নিঃশব্দ ছেলেটা সেদিন শেষবারের মতো পেছনে পড়ে রইল। সামনে যে মানুষটা হাঁটতে শুরু করল, তাকে আর নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচার অধিকার দেওয়া হবে না। তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নীরবতাও এখন হাজার মানুষের প্রত্যাশার অংশ। এখান থেকেই আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের শুরু।
১৩
মুক্তি পাওয়ার পর প্রথম তিন দিন আমি কোথাও যাইনি। নাঈম বারবার বলছিল, কিছুদিন আড়ালে থাক। রাকিবও ফোনে একই কথা বলল। “এখন তোরে রাস্তায় দেখলে আবার সমস্যা হইতে পারে।” কিন্তু সমস্যা যে শুধু আমাকে নিয়েই ছিল না, সেটা আমি জানতাম। ঘরের ভেতর বসে থাকা মানেই ছিল খবরের পর খবর দেখা, নতুন নতুন গ্রেপ্তারের তালিকা দেখা, আহতদের ছবি দেখা, আর নিজের অসহায়ত্বের সঙ্গে লড়াই করা।
চিলেকোঠায় ফিরে প্রথম রাতটা আমি একটুও ঘুমাতে পারিনি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছিল। সেই শব্দের ভেতরেও বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। কেউ দরজায় ধাক্কা দেবে। আবার আমাকে নিয়ে যাবে। ভোরের দিকে উঠে জানালার পাশে বসে ছিলাম। যে শহরটাকে এতদিন দূর থেকে দেখতাম, সেই শহরটা এখন যেন আমার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
চতুর্থ দিনের সকালে রাকিব হঠাৎ এসে হাজির হলো।
ওকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। কয়েক দিনের মধ্যে মুখটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি। দাড়ি এলোমেলো। কিন্তু চোখ দুটো আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থির।
“চল।”
“কোথায়?”
“শাহবাগ।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
“আবার?”
রাকিব আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইবার দর্শক হইয়া না।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো। আমি তো কোনোদিন নেতা হতে চাইনি। আমার কোনো সংগঠন ছিল না, কোনো পদ ছিল না, বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাসও ছিল না। আমি শুধু ভুল সময়ে একটা ছবির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর ঘটনাগুলো নিজের মতো করে আমাকে টেনে নিয়ে গেছে।
দুপুরের দিকে আমরা শাহবাগে পৌঁছালাম। আগের চেয়ে মানুষ আরও বেশি। শুধু ছাত্র নয়, অভিভাবক এসেছে, শিক্ষক এসেছে, শিল্পী এসেছে, রিকশাচালক এসেছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ নিজের হাতে পানি বিলাচ্ছেন। একজন চিকিৎসক ফুটপাতে বসে আহতদের সেবা দিচ্ছেন। আন্দোলনটা আর শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শহর ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে।
আমাদের দেখে প্রথমে কয়েকজন এগিয়ে এলো। তারপর আরও কয়েকজন। আমি বুঝে ওঠার আগেই চারপাশে ছোট্ট একটা ভিড় তৈরি হয়ে গেল। কেউ হাত মিলাতে চাইছে, কেউ বলছে, “ভাই, আপনাকে ছাড়া হয়তো ওরা আরও অনেককে তুলে নিয়ে যেত।” কেউ বলছে, “আপনারে ছাড়ানোর জন্যই আমরা রাস্তায় ছিলাম।”
আমি বারবার বলছিলাম, “আমার জন্য না। আন্দোলনের জন্য থাকবেন।”
কিন্তু মানুষ কখনও কখনও একজন মানুষের ভেতরেই একটা আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে নেয়। আমি যতই নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাইছিলাম, ততই সবাই আমাকে সামনে ঠেলে দিচ্ছিল।
বিকেলের দিকে কয়েকজন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কারী এসে আমাদের সঙ্গে বসল। রাস্তার মাঝখানেই গোল হয়ে আলোচনা শুরু হলো। কে কোথায় থাকবে, কোন কর্মসূচিতে কীভাবে মানুষকে সংগঠিত করা হবে, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা কীভাবে হবে, গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করবে, সবকিছু নিয়ে পরিকল্পনা চলতে লাগল। আমি চুপচাপ শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখানে আমার থাকার কথা নয়।
হঠাৎ একজন বলল, “আপনি কিছু বলেন।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“আমি বলার মানুষ না।”
আরেকজন হেসে বলল, “চার দিন আগে হয়তো ছিলেন না। এখন আছেন।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম ঠিকই, কিন্তু কথা শুরু করতে পারছিলাম না। এত মানুষের সামনে কোনোদিন দাঁড়াইনি। সামনে অসংখ্য চোখ। কেউ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ আবার শুধু শুনতে চায়।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আমি আপনাদের নেতা না। আমি আপনাদের মতোই একজন ছাত্র। যদি আমাকে আলাদা করেন, তাহলে ভুল করবেন। আজ আমাকে নিয়েছে, কাল অন্য কাউকে নেবে। তাই একজনকে বাঁচানোর আন্দোলন করবেন না। এমন একটা দেশের জন্য দাঁড়ান, যেখানে কাউকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া না যায়।”
আমি আর কিছু বলিনি।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই অল্প কথার পরই চারদিক হাততালিতে ভরে গেল।
আমি নিচে নেমে রাকিবের পাশে এসে দাঁড়ালাম। ও খুব আস্তে বলল, “দেখলি? মানুষ বক্তৃতা শুনতে আসে না। মানুষ সত্যি কথা শুনতে আসে।”
সেদিন সন্ধ্যায় প্রথমবার বুঝলাম, নেতৃত্ব আসলে সামনে দাঁড়ানোর নাম নয়। নেতৃত্ব অনেক সময় মানুষের প্রত্যাশার ভার কাঁধে তুলে নেওয়ার নাম। আমি সেই ভার নিতে চাইনি। কিন্তু শহর আমার অনুমতির অপেক্ষা করেনি।
সেদিনের পর থেকে আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আমাকে ডাকা হতে লাগল। সংবাদমাধ্যম আমার বক্তব্য চাইতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে প্রতিনিধিরা এসে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করত। একসময় খেয়াল করলাম, আমি আর নিজের সময়ের মালিক নই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহর আমাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে বেড়াচ্ছে।
আর আমি বুঝতে শুরু করলাম, মানুষ যখন একজন সাধারণ ছেলেকে সামনে দাঁড় করায়, তখন সে আর শুধু নিজের জীবনের দায়িত্ব বহন করে না। তার কাঁধে অজান্তেই হাজার মানুষের আশা এসে জমা হয়। সেই আশার ওজন, যেকোনো কারাগারের লোহার দরজার চেয়েও অনেক বেশি ভারী।
১৪
যেদিন থেকে সবাই আমাকে চিনতে শুরু করল, সেদিন থেকেই আমি নিজের মতো করে হাঁটার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেললাম। সকালে কোথায় যাব, দুপুরে কার সঙ্গে বসব, সন্ধ্যায় কোন কর্মসূচিতে থাকব, রাতের বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হবে, সবকিছুর মাঝখানে আমার নাম জড়িয়ে যেতে লাগল। কখন যে একটা সাধারণ ছাত্র থেকে আমি আন্দোলনের মুখগুলোর একজন হয়ে উঠেছি, নিজেই বুঝতে পারিনি।
শাহবাগ তখন শুধু একটা মোড় নয়। পুরো শহরের স্পন্দন যেন এসে সেখানে জমা হয়েছে। সকাল থেকে রাত, রাত থেকে ভোর, মানুষ আসছে, যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। কেউ পোস্টার লিখছে, কেউ মাইক সামলাচ্ছে, কেউ আহতদের তালিকা তৈরি করছে, কেউ নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আন্দোলন আর আবেগের জায়গায় নেই। ধীরে ধীরে সেটা সংগঠিত হতে শুরু করেছে।
প্রতিদিন বিকেলে আমরা কয়েকজন বসতাম। কোনো মঞ্চ ছিল না। কোনো আনুষ্ঠানিক চেয়ার-টেবিলও না। ফুটপাত, ডিভাইডার, কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ি, যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেত, সেখানেই আলোচনা চলত। কী দাবি হবে, কীভাবে জানানো হবে, কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় উত্তেজনা বাড়ছে, সবকিছু নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। প্রথম দিকে আমি শুধু শুনতাম। পরে একসময় খেয়াল করলাম, মানুষ আমার দিকেও তাকিয়ে থাকে। আমি কী বলি, সেটাও তারা শুনতে চায়।
এই দায়িত্বটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাত।
কারণ আমি জানতাম, উত্তেজিত জনতাকে উত্তেজিত করা খুব সহজ। কঠিন কাজ হলো হাজার মানুষের রাগকে এমনভাবে ধরে রাখা, যেন তা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে না যায়।
একদিন বিকেলে রাকিব বলল, “দাবিগুলা লিখে ফেলতে হবে। মানুষের হাতে পরিষ্কার কথা থাকতে হবে।”
আমরা কয়েকজন মিলে খসড়া লিখতে শুরু করলাম। বারবার কেটে দিলাম, আবার লিখলাম। এমন ভাষা চাই, যাতে রাগ আছে, কিন্তু হিংসা নেই। দৃঢ়তা আছে, কিন্তু প্রতিশোধ নেই। আমরা চাইছিলাম আন্দোলনকে এমন একটা জায়গায় দাঁড় করাতে, যেখানে মানুষ দাবি দেখবে, শুধু ক্রোধ না।
রাতের দিকে সেই খসড়া পড়ে শোনানো হলো। আশ্চর্যজনকভাবে কেউ নিজের কথা চাপিয়ে দিতে চাইল না। সবাই যুক্তি দিল, তর্ক করল, শব্দ বদলাল। তখন বুঝেছিলাম, গণতন্ত্র সংসদ ভবনের ভেতর শুরু হয় না। গণতন্ত্র শুরু হয় তখন, যখন দশজন মানুষ নিজেদের মতের সঙ্গে অন্যের মতও শুনতে শেখে।
পরদিন সকালেই দাবিগুলো শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে গেল। হাতে লেখা পোস্টার, লিফলেট, ফটোকপি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সব জায়গায় একই ভাষা। আন্দোলন এবার একটা স্পষ্ট দিক পেল।
তারপর শুরু হলো নতুন চাপ।
বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ দেখা করতে আসছে। শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবক। কেউ সমর্থন জানাচ্ছেন, কেউ সতর্ক করছেন, কেউ বলছেন সাবধানে এগোতে। আবার কেউ কেউ খুব কৌশলে আন্দোলনের ভেতরে নিজেদের প্রভাব তৈরি করতে চাইছেন। আমি প্রথমবার বুঝলাম, রাজপথে শুধু প্রতিবাদ থাকে না, সেখানে স্বার্থও এসে ভিড় করে।
এক রাতে বৈঠক শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর আমি আর রাকিব শাহবাগের মোড়ে বসে ছিলাম। চারপাশ প্রায় ফাঁকা। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক ব্যানার গুটিয়ে রাখছে। দূরে একজন রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছে। সারাদিনের স্লোগানের পর শহরটাও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
আমি বললাম, “আমরা পারব?”
রাকিব সিগারেট ধরিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না। কিন্তু এখন আর পেছনে ফেরার রাস্তা নাই।”
আমি মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালাম।
চিলেকোঠার সেই ছোট্ট জানালাটা মনে পড়ল।
কয়েক সপ্তাহ আগেও আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল মাসের ভাড়া, টিউশনি আর পরীক্ষার সিলেবাস। এখন হাজার হাজার মানুষ আমাদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে।
১৫
১৫. চাপ
আন্দোলনের বয়স তখন আর কয়েক দিনের নয়। শহর বুঝে গেছে, এটা হঠাৎ জেগে ওঠা কোনো ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা না। প্রতিদিন মানুষ নামছে, প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ যোগ দিচ্ছে। আবার প্রতিদিনই আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার নতুন নতুন চেষ্টা হচ্ছে। দিনের শেষে আমরা যতটা পুলিশের সঙ্গে লড়ছিলাম, তার চেয়ে বেশি লড়ছিলাম গুজব, বিভ্রান্তি আর ভয়কে নিয়ে।
শাহবাগের অস্থায়ী সমন্বয় কক্ষে সেদিন বিকেল থেকেই একের পর এক বৈঠক চলছিল। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধি এসেছে। কেউ খুলনা থেকে, কেউ রাজশাহী থেকে, কেউ চট্টগ্রাম থেকে রাতভর বাসে চড়ে ঢাকায় পৌঁছেছে। তাদের সবার কথার ভেতর একটা বিষয়ই ঘুরে ফিরে আসছিল, আন্দোলন এখন শুধু ঢাকার নেই। পুরো দেশের শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে দাঁড়িয়ে গেছে।
কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার জমছিল।
কারণ আমি জানতাম, আন্দোলন যত বড় হবে, চাপও তত বড় হবে।
সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন সাংবাদিক দেখা করতে এলেন। একই প্রশ্ন, একই কৌতূহল।
“এখন আপনাদের পরবর্তী কর্মসূচি কী?”
“সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন?”
“আপনারা কি আন্দোলন স্থগিত করার কথা ভাবছেন?”
আমি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুব সতর্কভাবে দিচ্ছিলাম। একটা ভুল বাক্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার রকম ব্যাখ্যায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বুঝতে পারছিলাম, এখন আর আমি শুধু নিজের হয়ে কথা বলছি না। আমার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে হাজার মানুষের প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে।
রাত নামার পর রাকিব আমাকে এক পাশে ডেকে নিল।
তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ।
“দেখ।”
কাগজটা খুলতেই দেখি কয়েকটা শর্ত লেখা।
কোনো স্বাক্ষর নেই।
কোনো পরিচয় নেই।
শুধু লেখা, আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলে কয়েকটি বিষয়ে ‘সহযোগিতা’ করা হবে।
আমি পুরো কাগজটা পড়ে চুপ করে রইলাম।
রাকিব বলল, “আজ দুপুরে একজন দিয়া গেছে।”
“কী বলছিস?”
“কথা পরিষ্কার। আন্দোলন থামলে অনেক কিছু সহজ হবে।”
আমি কাগজটা দুমড়ে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম।
সেই মুহূর্তে প্রথমবার বুঝলাম, আন্দোলন শুধু রাজপথে হয় না। বন্ধ দরজার আড়ালেও আন্দোলনকে থামানোর চেষ্টা চলে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর আসতে লাগল, বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর আবার চাপ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও অভিভাবকদের ফোন করা হয়েছে। কোথাও হল খালি করার নির্দেশ এসেছে। কোথাও আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরি হচ্ছে।
আমরা আবার গোল হয়ে বসলাম।
প্রশ্ন একটাই।
এখন কী করা হবে?
অনেক মতামত এলো। কেউ বলল আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে হবে। কেউ বলল কিছুটা সময় নিতে হবে। কেউ বলল আলোচনার সুযোগ থাকলে সেটা নষ্ট করা ঠিক হবে না।
আমি এতক্ষণ চুপ ছিলাম।
শেষে বললাম, “একটা কথা মনে রাখেন। আমরা যদি রাগের কারণে সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে ভুল করব। আবার যদি ভয় থেকে সিদ্ধান্ত নিই, তাহলেও ভুল করব। আমাদের সিদ্ধান্ত শুধু একটা জিনিস থেকে আসতে হবে, যে কারণে মানুষ প্রথম দিন রাস্তায় নেমেছিল।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
কেউ আর সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না।
কয়েক মিনিট পর একজন শিক্ষক, যিনি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন, ধীরে বললেন, “তোমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এটাই। এখনও তোমরা উদ্দেশ্য ভুলে যাওনি।”
রাত প্রায় দুটো।
বৈঠক শেষ হলো।
বাইরে বেরিয়ে দেখি শাহবাগ প্রায় ফাঁকা। বাতাসে ছেঁড়া পোস্টার উড়ছে। দূরে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক রাস্তার পাশে বসে চা খাচ্ছে। শহরটা যেন ক্লান্ত, কিন্তু পরাজিত নয়।
আমি অনেকক্ষণ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো, কয়েক সপ্তাহ আগেও এই শহরে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। আজ সেই একই শহর আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর তখনই বুঝলাম, সামনে যে লড়াইটা আসছে, সেটা আর শুধু আন্দোলন টিকিয়ে রাখার না।
এবার লড়াই হবে ক্ষমতার সঙ্গে ধৈর্যের।
১৬
শাহবাগে সেদিন মানুষের ভিড় অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা ছিল।
কেউ কাউকে ডেকে আনেনি। কোনো ঘোষণা ছিল না। তবু দুপুর গড়ানোর আগেই চারদিক মানুষে ভরে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রবেশপথ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, বাংলামোটর, সব রাস্তা যেন এক জায়গায় এসে মিশেছে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম মঞ্চের পেছনে। সামনে মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এত মানুষকে একসঙ্গে দেখলে ব্যক্তিগত সাহস বলে কিছু থাকে না। মানুষ তখন নিজর জন্য দাঁড়ায় না। সবাই সবার জন্য দাঁড়ায়।
রাকিব এসে আমার পাশে দাঁড়াল। কয়েক রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি তার চোখে স্পষ্ট। তবু আজ ওর মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
“সবাই অপেক্ষা করতেছে।”
আমি সামনে তাকিয়ে রইলাম।
“আমার জন্য না।”
“না,” রাকিব বলল, “আজ কথার জন্য।”
মঞ্চে ওঠার আগে আমি নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। প্রথম সারিতে কয়েকজন স্কুলছাত্র। তাদের কাঁধে এখনও স্কুলব্যাগ। একটু দূরে আহত কয়েকজন ছাত্র, কারও হাতে ব্যান্ডেজ, কারও মাথায় সাদা কাপড় বাঁধা। আরও পেছনে অভিভাবকরা। বৃদ্ধ মানুষও আছেন। রিকশাচালকও দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একপাশে নীরবে সবকিছু দেখছেন। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এই আন্দোলন আর কোনো একটি শ্রেণির নেই। এটা এখন শহরের।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এত মানুষের নীরবতা আমি আগে কোনোদিন শুনিনি।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আজ আমি কোনো বক্তৃতা দিতে আসিনি। আমরা কেন রাস্তায় নেমেছিলাম, শুধু সেটাই মনে করিয়ে দিতে এসেছি।”
বাতাস পর্যন্ত যেন থেমে গেল।
“আমাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, কোনো দল বা কোনো প্রতিশোধের জন্য না। আমরা এমন একটা রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে, নিরাপদে প্রতিবাদ করতে পারে, আর নিরাপদে নিজের বাড়ি ফিরতে পারে।”
আমি কিছুক্ষণ থামলাম।
তারপর স্পষ্ট গলায় বললাম,
“আজ আমরা দুইটি চূড়ান্ত দাবি জানাচ্ছি।”
চারদিক নিস্তব্ধ।
“প্রথম দাবি, দায়িত্বে থাকা সড়ক মন্ত্রী অবিলম্বে পদত্যাগ করবেন এবং এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় স্বীকার করবেন।”
মানুষের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে গর্জন উঠল।
আমি হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলাম।
“দ্বিতীয় দাবি, এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক বা নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসামূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। গ্রেপ্তার, হয়রানি বা মামলা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
এবার আর মানুষের আবেগ থামানো গেল না।
হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠল।
কেউ স্লোগান দিচ্ছে।
কেউ কাঁদছে।
কেউ অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরছে।
আমি মাইক্রোফোন থেকে একটু সরে এলাম।
এই মুহূর্তটা আমার না।
এই মুহূর্তটা তাদের।
রাকিব খুব আস্তে এসে বলল, “এখন কী হবে?”
আমি ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “এখন সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে না।”
“তাহলে?”
“এখন সিদ্ধান্ত ইতিহাসের হাতে।”
সন্ধ্যা নামার আগেই দাবি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, জেলা থেকে জেলায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মানুষের মুখে মুখে একই দুটি দাবি ঘুরতে লাগল। কেউ আর নতুন কিছু যোগ করতে চাইছিল না। আন্দোলনের ভাষা এবার পরিষ্কার। তার চেয়েও পরিষ্কার ছিল মানুষের অবস্থান।
রাত গভীর হওয়ার পর শাহবাগে বসে ছিলাম আমি, রাকিব আর নাঈম।
চারপাশে ক্লান্ত মানুষ মাটিতে বসে আছে। কেউ পোস্টারের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ চা খাচ্ছে। কেউ আবার চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে।
আমি অনেকক্ষণ পর বললাম, “যদি কিছুই না হয়?”
রাকিব উত্তর দিল না।
নাঈমও না।
কারণ আমাদের তিনজনেরই জানা ছিল, পরের সকালটা শুধু আরেকটা সকাল হবে না।
পরের সকাল হয়তো একটা সরকারের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে।
১৭
পরদিন ভোর থেকেই ঢাকা শহরের চেহারা বদলে গেল।
যে শহর প্রতিদিন মানুষের শব্দে ঘুম ভাঙে, সেদিন তার ঘুম ভাঙল নীরবতায়। দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা। বাস চলছে, কিন্তু যাত্রী কম। অফিসগামী মানুষ রাস্তায় আছে, কিন্তু কারও চোখে অফিসের তাড়া নেই। সবাই মোবাইলের পর্দায় তাকিয়ে আছে। কেউ খবর পড়ছে, কেউ লাইভ দেখছে, কেউ ফোনে শুধু একটা প্রশ্ন করছে, “কিছু হলো?”
আমরা শাহবাগে পৌঁছানোর আগেই বুঝে গেলাম, আজকের দিনটা অন্যরকম।
রাস্তার দুই পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ স্লোগান দিচ্ছে না। কেউ উত্তেজিত না। শুধু অপেক্ষা করছে।
অপেক্ষা, অনেক সময় স্লোগানের চেয়েও শক্তিশালী।
দুপুরের দিকে খবর এলো, সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি যোগাযোগ করতে চেয়েছেন। তারা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই চারদিকে গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ বলছে, এটাই বিজয়ের শুরু। কেউ বলছে, এটা সময় নেওয়ার কৌশল।
আমরা আবার গোল হয়ে বসলাম।
ঘণ্টাখানেক ধরে শুধু আলোচনা চলল।
কেউ বলল, “যাওয়া উচিত।”
কেউ বলল, “না, এখন গেলে ভুল বার্তা যাবে।”
সবাই যখন নিজের মতামত দিচ্ছে, তখন আমার দিকে তাকাল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “আমরা আলোচনার জন্য রাস্তায় নামিনি। আমরা দাবির জন্য নেমেছি। দাবি পূরণ হলে আলোচনার প্রয়োজন থাকবে না। দাবি পূরণ না হলে আলোচনারও অর্থ থাকবে না।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
রাকিব ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে?”
আমি বললাম, “আমাদের অবস্থান বদলাবে না।”
সিদ্ধান্তটা খুব ছোট ছিল।
কিন্তু সেই ছোট সিদ্ধান্তই বিকেলের মধ্যে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ল।
কোনো গোপন বৈঠক নয়।
কোনো সমঝোতা নয়।
দুই দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগে মানুষের ঢল আরও বাড়তে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশে স্কুলশিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছে। তাদের পাশে অভিভাবকরা। চিকিৎসকেরা চিকিৎসা শিবির খুলেছেন। কয়েকজন আইনজীবী স্বেচ্ছাসেবক হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা করছেন। শিল্পীরা পোস্টার আঁকছেন। কেউ আর কাউকে নির্দেশ দিচ্ছে না। তবু সবকিছু চলছে আশ্চর্য এক শৃঙ্খলায়।
আমি মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো, এই আন্দোলন অনেক আগেই আমাদের হাত ছেড়ে দিয়েছে।
এখন এটা মানুষের।
রাত আটটার দিকে আবার মাইক্রোফোন হাতে নিলাম।
চারদিকে এমন নীরবতা নেমে এল যে দূরের আজানের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“আজ আবার পরিষ্কার করে বলছি। আমাদের অবস্থান বদলায়নি। আমরা কোনো গোপন সমঝোতা করব না। আমরা কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাই না। আমাদের দুটি দাবিই আজও বহাল আছে। দায়িত্বে থাকা সড়ক মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসামূলক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।”
কথা শেষ হতেই মানুষের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে এক ঢেউ উঠল।
সেটা স্লোগানের ঢেউ ছিল না।
সেটা ছিল সম্মতির।
আমি নিচে নেমে এলাম।
রাকিব আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আজ আর ভয় লাগতেছে?”
আমি হাসলাম।
“ভয় এখনও লাগে।”
“তাহলে এত শান্ত কেমনে?”
আমি অনেকক্ষণ পর উত্তর দিলাম,
“কারণ আজ বুঝছি, ভয়টা আমার একার না। আর সাহসটাও আমার একার না।”
রাত গভীর হতে থাকল।
ঢাকা ঘুমাল না।
কেউ জানত না, পরদিন কী ঘোষণা আসবে।
কিন্তু সবাই জানত, এই রাতের পর আর আগের সকালে ফেরা সম্ভব নয়।
১৮
পরদিন সকাল থেকেই রাজধানী যেন নিঃশ্বাস আটকে ছিল।
শাহবাগে পৌঁছানোর আগেই বুঝলাম, শহরটা আজ আর স্বাভাবিক নেই। রাস্তায় গাড়ি চলছে, কিন্তু মানুষের মন অন্য কোথাও। দোকান খোলা, কিন্তু বিক্রি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ক্লাসের আলোচনা নেই। সবাই একই খবরের অপেক্ষায়।
আমরা মঞ্চের পেছনে বসে ছিলাম। কেউ খুব বেশি কথা বলছিল না। গত কয়েক সপ্তাহে আমরা এত কথা বলেছি যে, শেষ মুহূর্তে এসে ভাষা যেন ফুরিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে কেউ ফোনে নতুন খবর জানাচ্ছে, আবার মাথা নিচু করে বসে পড়ছে।
দুপুরের দিকে গুঞ্জন শুরু হলো।
কেউ বলছে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
কেউ বলছে এখনও হয়নি।
কেউ বলছে আর একটু অপেক্ষা।
এই “আর একটু” কথাটা সেদিন সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মতো মনে হচ্ছিল।
বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ মানুষের ভিড়ের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খবরটা দৌড়ে গেল। কেউ নিশ্চিত না হয়েও বলতে শুরু করেছে, ঘোষণা আসছে।
আমরা কেউ বিশ্বাস করলাম না।
অনেকবারই তো এমন খবর এসেছে।
অনেকবারই মানুষ আশায় বুক বেঁধে আবার হতাশ হয়েছে।
হঠাৎ রাকিবের ফোন বেজে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড কথা শুনল।
তারপর আমার দিকে তাকাল।
মুখে কোনো হাসি নেই।
শুধু ফিসফিস করে বলল,
“হইছে।”
আমি কিছু বুঝতে পারলাম না।
“কী হইছে?”
সে ধীরে ধীরে বলল,
“পদত্যাগ করছে।”
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনে হচ্ছিল, শব্দগুলো ঠিকমতো কানে পৌঁছাচ্ছে না।
কয়েক সেকেন্ড পর শাহবাগ যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
চারদিক থেকে মানুষের চিৎকার।
কেউ কাঁদছে।
কেউ সিজদায় পড়ে গেছে।
কেউ অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
কেউ জাতীয় পতাকা মাথার ওপরে তুলে দৌড়াচ্ছে।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
এই দৃশ্যটা আমি বহুবার কল্পনা করেছি।
কিন্তু বাস্তবে এর কোনো শব্দ নেই।
শুধু মানুষের কান্না আছে।
রাকিব আমার কাঁধে হাত রাখল।
“চল।”
“কোথায়?”
“মঞ্চে।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“না।”
“কেন?”
আমি ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আজ আর আমাদের মঞ্চে দাঁড়ানোর দিন না।”
“তাহলে?”
“আজ মানুষ জিতছে। মানুষকেই সামনে থাকতে দে।”
আমরা মঞ্চের পেছনেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
হাজার হাজার মানুষ সামনে।
কেউ আমাদের খুঁজছে।
কেউ ডাকছে।
কিন্তু আমরা আর সামনে গেলাম না।
কারণ যেদিন কোনো আন্দোলনের কৃতিত্ব কয়েকজন মানুষের হাতে চলে যায়, সেদিনই সেই আন্দোলনের ইতিহাস ছোট হয়ে যায়।
সন্ধ্যা নামার আগে আরেকটি ঘোষণা এলো।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই আবারও উল্লাসে ফেটে পড়ল চারদিক।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
আমার মনে পড়ল সেই চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটার কথা।
যে ঘরে বসে আমি একদিন লিখেছিলাম,
“আজ ঢাকা আমাকে চিনে ফেলেছে।”
আজ মনে হলো, আমিও হয়তো প্রথমবার ঢাকাকে চিনতে পারলাম।
কিন্তু সেই মুহূর্তে, শহরজুড়ে যখন মানুষের বিজয়ের উল্লাস, তখন রাজধানীর আরেক প্রান্তে, ক্ষমতার এক নীরব কক্ষে, টেবিলের ওপর একটি ছবি নিঃশব্দে পড়ে ছিল।
ছবিটায় কয়েকজন তরুণ।
তাদের চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মাথা উঁচু।
ঘরের ভেতরে বসে থাকা ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি দীর্ঘক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে ছবিটা হাতে তুলে নিলেন।
আঙুলের চাপ ক্রমশ শক্ত হতে লাগল।
একসময় ছবিটা মুঠোর ভেতর কুঁচকে গেল।
জানালার বাইরে তখনও মানুষের স্লোগান ভেসে আসছিল।
আর সেই কুঁচকে যাওয়া ছবির ভাঁজের মধ্যে যেন লুকিয়ে রইল এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা।
Leave a Reply